স্বপন চক্রবর্তী-র কথা ক্যানভাস

কবিজন্ম

শুধু কবিতার জন্য

স্বপন চক্রবর্তী



কবিতার প্রতি আমার অনুরাগ শৈশবে । প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম । পরিচয় হল দুই কবির সাথে ।  রবি ঠাকুর এবং   নজরুল ইসলাম । গান্ধী ও নেতাজির সঙ্গে দুই কবির ছবি  ছিল প্রধান শিক্ষকের ঘরে ।  অনুষ্ঠান উপলক্ষ্যে তাঁদের মালা চন্দনে বরণ করা হত ।  আবৃত্তি করতাম, 

" কুমোর পাড়ার গোরুর গাড়ি

বোঝাই করা কলসি হাড়ি.....।"

দাড়ি কমার বালাই ছিলনা । মনের আনন্দে রেলগাড়ি ছুটত ঝমঝমিয়ে । 


 ঠাকুরদার কোলে কোলে আমার পাঠ শুরু । ঠাকুরদা মুখে মুখে বলতেন । আমি শুনে শুনে শিখতাম । তখনও সহজ পাঠ আসেনি  ।

 " ছোটো খোকা বলে অ আ

 শিখেনি সে কথা কওয়া " সহজপাঠের সহজ ছন্দ দিয়ে আমাদের বিদ্যারম্ভ হয়নি । 

" অজগর আসছে তেড়ে

 আমটি আমি খাব পেড়ে " এই দিয়ে আমাদের যাত্রা শুরু ।  শুনি আর শিখি । কত ছড়া , কত কবিতা শিশু হৃদয়ে জায়গা করে নিল ।  ছড়ার ছন্দে প্রাণের আনন্দে শিখতে লাগলাম ।  ছড়াই আমাদের ভাষা শিক্ষার প্রথম সোপান । শুধু আমাদের দেশে কেন , দেশে দেশে , যুগে যুগে  ছড়ার মাধ্যমেই শিশুদের ভাষা শেখার শুরু হয় । বাংলা , ইংরেজি , হিন্দি সব ভাষাতেই ।  হিন্দিতে যেমন  " মছলি জলদি রানি হ্যায় ", ইংরেজিতে তেমনি "হামটি ডামটি" অথবা "বা বা ব্ল্যাক শিপ  " । অর্থাৎ সবদেশে ভাষা শিক্ষার ক্ষেত্রে শিশু মনে ছাড়ার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে । 


ঠাকুরদার কাছ থেকে শিখলাম কবিতা ,

" পাখি সব করে রব রাতি পোহাইল

কাননে কুসুমকলি সকলি ফুটিল 

রাখাল গরুরপাল লড়ে যায় মাঠে

শিশুগণ দেয় মন নিজ নিজ পাঠে....."

 কবির নাম জানতাম না । কিন্তু কবিতার ভাষা , ছন্দ এবং তার বর্ণনার মধ্য দিয়ে সেই বয়সেই মনের মধ্যে একটা দৃশ্যকল্প তৈরি হয়েছিল মনের মধ্যে । সকালের প্রকৃতি খুব সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছিল সে কবিতায় । একটু বড় হয়ে জানতে পারলাম কবির নাম । মদনমোহন তর্কালঙ্কার । আমার শেখা প্রথম কবিতা । এবং কবিতার সাথে সখ্যতার সেই শুরু । প্রাথমিকে জাতীয় সঙ্গীত শিখলাম ।  ঢং ঢং করে ঘন্টা বাজত । আমরা  একসাথে গাইতাম ,

" তব শুভ নামে জাগে

 তব শিস আশিস মাগে ...." ঠিক তক্ষুনি নাক দিয়ে জল ঝরতে থাকত । প্রায় সকলের । সমবেত নাকটানার শব্দ । তার সাথে তাল মিলিয়ে জাতীয় সঙ্গীত ! শৈশবের সুন্দর স্মৃতি ফিরে আসে বারে বারে ।প্রায় সত্তর বছর হয়ে গেল । কী আশ্চর্য!  শহরের নামিদামী স্কুলগুলোর কথা জানিনা কিন্তু গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলিতে আজও ঠিক এইভাবেই গান গায় শিশুরা । দিন বদলেছে । যুগ বদলেছে কিন্তু গ্রামের শিশুদের গান গাওয়ার ধরন আজও বদলায়নি । সেই ট্রাডিশন.....।  


ক্লাস ফোর শুরু হল সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের কবিতা দিয়ে , 

 " কোন দেশেতে তরুলতা সকল দেশের চাইতে শ্যামল

   কোন দেশেতে চলতে গেলে দলতে হয় রে দূর্বা কোমল ...."  বাংলার শ্যামল সবুজ প্রকৃতি ধরা দিল শিশু হৃদয়ে । আমাদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তখন ব্রতচারি শেখান হত । একবার বাণীপুর থেকে মৃত্যুঞ্জয় বক্সি এলেন বিদ্যালয় পরিদর্শনে । ধুতি পাঞ্জাবি পরনে একমাথা সাদা চুল । তিনি আমাদের ব্রতচারি দেখতে চাইলেন । আমি ছিলাম ক্লাসের মধ্যে সব চাইতে ছোট । উনি কেন জানি না, আমাকেই দলটির নেতৃত্ব দিতে বললেন । আমরা সকলে  মিলে একটি বৃত্ত রচনা করলাম । আমি রইলাম বৃত্তের মাঝে  । বেশ ভয় করছিল।  লজ্জাও লাগছিল । প্রধান শিক্ষক ফণীদা (  ফণীভূষণ রায় ) অভয় দিতে  গান ধরলাম । সকলে গলা মেলাল, 

"হল মাটিতে চাঁদের উদয়

কে দেখবি আয়

এমন যুগল চাঁদ কেউ দেখিস নাই

দেখ সে নদীয়ায় ......."

 গান শেষে মৃত্যুঞ্জয়বাবু আমায় জড়িয়ে ধরে আশীর্বাদ করলেন । জানতে চাইলেন গানটি কার লেখা । বলতে পারলাম না । আমরা গানগুলি শুধু মুখস্থই করেছি কার লেখা জানা হয়নি । তিনি বললেন রচয়িতার নাম । পরিচয় হল ব্রতচারির স্রষ্টা গুরুসদয় দত্তের সাথে। পরিচয় বাড়ছে আর  একটু একটু করে আমার হৃদয়ে প্রোথিত হচ্ছে কবিতার বীজ ।


ছোটকাকা তখন গোবরডাঙা হিন্দু কলেজে পড়েন। ছোটকাকার  পাঠ্য ছিল দুটি কাব্যগ্রন্থ ।  রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের" কথা ও কাহিনি " এবং হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের " বৃত্রসংহার " । কাকা সকালে উঠে প্রায়ই কথা ও কাহিনির কবিতাগুলো আবৃত্তি করতেন । সুরে , তালে , ছন্দে এবং কন্ঠের ওঠানামায় আমি অভিভূত হয়ে যেতাম ।

" কথা কও কথা কও অনাদি অতীত 

  অনন্ত রাতে কেন বসে চেয়ে রও

  কথা কও কথা কও "

এইভাবে কখনো দুই বিঘা জমি , কখনো দেবতার গ্রাস, অভিসার, পূজারিনি ,  পণরক্ষা , কর্ণকুন্তী সংবাদ শুনতে শুনতে আমার হৃদয়ে কাব্যের দোলা লাগল । কবিতার বীজ অঙ্কুরিত হল আমার মনের গভীরে । ছোটকাকার হাত ধরে কবিতার সাথে আমার সখ্যতা হল । আমি কবিতাকে ভালবাসতে শিখলাম । "কথা ও কাহিনি" আমাকে কবিতার অনুরাগী করে তুলল ।


ক্লাস ফাইভে উঠে কুমুদ রঞ্জন মল্লিক , জসিমুদ্দিন, বিহারীলাল চক্রবর্তী, কামিনী রায় এবং মাইকেল মধুসূদন দত্তের কবিতার সাথে পরিচয় হল । পরিচয় হল অমিত্রাক্ষর ছন্দের সাথে । কলেজে যখন উঠলাম তখন নকশাল আমল । বিপ্লবের পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে । দেয়ালে দেয়ালে আলকাতরা দিয়ে লেখা হচ্ছে " চিনের চেয়ারম্যান আমাদের চেয়ারম্যান । " সেই অশান্ত সময়ে  বোমার শব্দে  যখন ঘুম ভাঙছে আবার বোমার শব্দে ঘুমোতে যাচ্ছি , প্রতিদিন রাজনৈতিক সংঘর্ষ । খুন  । রক্তপাত । সেই আতঙ্কের আবহে ডান, বাম , বিপ্লবী প্রতিবিপ্লবী সব মিলেমিশে একাকার হয়ে যেত যে দুটি ক্লাসে তাঁদের একজন হলেন  অধ্যাপক সুবোধ প্রামাণিক ।  অপরজন অধ্যাপক সৌরেণ বসু । একজন বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপক । অন্যজন ইংরাজি সাহিত্যের । সুবোধবাবু পড়াতেন মাইকেলের " মেঘনাদ বধ কাব্য " , সৌরেণবাবু শেক্সপীয়রের " জুলিয়াস সিজার "।  সাহিত্যকে তাঁরা এমন একটা পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলেন  যে, পারতপক্ষে কেউ ক্লাস দুটি মিস করতে চাইত না । এ শুধু পাঠদান ছিল না  । তার মধ্যে ছিল সাহিত্যের প্রতি তাঁদের অনুরাগ আর প্রগাঢ় ভালবাসা । সুবোধবাবুর দৌলতে নতুন করে চিনলাম বাংলা আধুনিক কবিতার জনক মাইকেলকে । পাঠ করলাম " মেঘনাদ বধ কাব্য " ।  বাংলা সাহিত্যের প্রতি আগ্রহ বাড়ল । পাশাপাশি সৌরেণবাবুর হাত ইংরেজি সাহিত্যের প্রতিও খানিকটা  আকর্ষণ বাড়ল । 


ততদিনে রবীন্দ্রনাথ , নজরুলের পাশাপাশি পরিচয় হয়েছে জীবনানন্দ দাসের কবিতার সাথে ।

" বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি

তাই আমি পৃথিবীর রূপ খুঁজিতে যাই না আর

অন্ধকারে জেগে দেখি ডুমুরের গাছে ছাতার মত বড় পাতাটির নীচে বসে আছে ভোরের দোয়েল পাখি

চারিদিকে চেয়ে দেখি পল্লবের স্তূপ

জাম বট কাঁঠালের হিজলের 

করে আছে চুপ......"।

একে একে দেখা 


বাঙালি একটি বয়সে সবাই কবি । আজ যতই সাহিত্যের পাঠ কমে যাক না কেন , যতই তরুণ প্রজন্ম মোবাইলে বুঁদ হয়ে থাকুক , কবিতার চলা কিন্তু থেমে নেই । প্রতিদিন একটু একটু করে এগিয়ে চলেছে । সৃষ্টির পথ রুদ্ধ হয়নি আজও । ফেসবুকের  দৌলতে এখন  প্রতিদিন সহস্র কবির জন্ম হচ্ছে । বিশুদ্ধবাদীরা যতই নাক সিঁটকোন  বাঙালি হিসেবে অবশ্যই আমরা গর্ব করতে পারি । এরা কেউ বোমা পিস্তল ধরেনি , তোলাবাজি করেনি , নেতাদের পিছনে তেলের বাটি নিয়েও ছোটেনি ,  মেতে আছে সৃষ্টির আনন্দে । তার মধ্যে কতগুলি কবিতা আর কতগুলি নয় 

 তা নিয়ে অবশ্য অনেক সংশয় আছে ।  তবে বাংলা কবিতাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে তাদের এই অবদান  কিন্তু অস্বীকার করার উপায় নেই । 


কবিতা কিন্তু থেমে নেই । এগিয়ে চলেছে । হাজার বছর ধরে তার পথ চলা । সেই চর্যাপদের আমল থেকে ।

হাজার বছর ধরে নানা চড়াই উতরাই পেরিয়ে কত উত্থান পতনের মধ্য দিয়ে আজ বাংলা ভাষা ধ্রুপদী ভাষার মর্যাদা লাভ করেছে । ঢেউয়ের মত নানা ওঠাপড়ার মধ্য দিয়ে গতিশীল হয়েছে,  সমৃদ্ধ হয়েছে সে ইতিহাস  । চর্যাপদকে বাংলা ভাষার প্রথম কবিতা ধরা হয় । বাংলার প্রাচীন কাব্য, সাহিত্য ও  ভাষার নমুনা হল চর্যাপদ । বৌদ্ধ সহজিয় সাধকরা  এগুলো রচনা করেন । চর্যাপদের ভাষা সান্ধ্য ভাষা । যেখানে রূপকের মাধ্যমে  আধ্যাত্মিক সাধনার কথা বলা হয়েছে ।

" কাআ তরুবর পঞ্চ বি ডাল ।       

  চঞ্চল  চি এ পাইঠো কাল।। "

চর্যাপদকে অতিক্রম করে শ্রীকৃষ্ণকীর্তন, বৈষ্ণব পদাবলী , মঙ্গলকাব্য , রামায়ণ মহাভারতের অনুবাদ পর্যন্ত বাংলায় এক সহজ , স্বচ্ছন্দ ভাষার প্রচলন হল ।  শ্রীকৃষ্ণকীর্তন   মধ্য যুগের  বাংলা সাহিত্যের একটি অন্যতম প্রধান নিদর্শন । মধ্য যুগেই রচিত হয় মঙ্গল কাব্য । মনসামঙ্গল , চন্ডীমঙ্গল । রাধাকৃষ্ণের প্রেম , ভক্তি এবং ধর্মীয় চেতনা নিয়ে বিদ্যাপতি, চন্ডীদাস , জ্ঞানদাস , গোবিন্দদাস  , মুকুন্দরাম পদ রচনা করেন। রচিত হয় বৈষ্ণব পদাবলী ।

বৈষ্ণব পদাবলীর একটি বিখ্যাত পদ মনে পড়ছে , জ্ঞানদাসের রচনা ,

" রূপ লাগি আঁখি ঝুরে গুণে মন ভোর 

প্রতি অঙ্গ লাগি কান্দে প্রতি অঙ্গ মোর ।

হিয়ার পরশ লাগি হিয়া মোর কান্দে

পরান পিরীতি মোর থির নাহি বান্ধে ।। " কৃষ্ণের জন্য রাধার যে আকুলতা জ্ঞানদাসের  পদের ছত্রে ছত্রে ফুটে উঠেছে । রাধার এই আকুতি আজও বাঙালি পাঠককে ব্যাকুল করে তোলে । কবিতার এখানেই সার্থকতা । কোন যুগের গন্ডীতে সে বন্দী থাকেনা । সূর্যের আলোর মত তার প্রভা সকল যুগের পাঠকের বুকে ছুঁইয়ে আলোর পরশ । মধ্যযুগে কৃত্তিবাস ওঝা রামায়ণ ও কাসীরাম দাস মহাভারত অনুবাদ করেন । মালাধর বসু অনুবাদ করেন শ্রীকৃষ্ণ বিজয় । এঁরা সকলেই মিলে বাঙালি পাঠককে কবিতার অনুরক্ত করে তুলেছেন ।

 

তারপর ঈশ্বর গুপ্তের  হাত ধরে মধ্যযুগের সাথে আধুনিক যুগের সংযোগ স্থাপিত হল । ভোরের পাখি বিহারীলালের হাত ধরে ইউরোপীয় ভাবধারার সাথে পরিচিত হলেন বাঙালি পাঠক , সেইসময়   বাংলা সাহিত্যে ঝড় তুলে আবির্ভাব হল মাইকেল মধুসূদন দত্তের । যে মানুষ ছাত্রজীবনে ভাল বাংলা লিখতে পারতেন না । পৃথিবী লিখতে প্রথিবী লিখতেন । ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন ছিল ইংরেজি ভাষার মহাকবি হবেন । বায়রন , কীটস , শেলীর মত কবিতা লিখবেন । ইংরেজির স্বপ্নে বিভোর কবি বাংলা ভাষাকে নিয়ে অনেক তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করেছেন সেই তিনি বাংলা কবিতাকে পৌঁছে দিলেন সুউচ্চ শিখরে । অন্তমিল বর্জন করে  প্রবর্তন করলেন অমিত্রাক্ষর ছন্দের । বাংলা ভাষাকে অবহেলা করার জন্য তার আক্ষেপ ফুটে উঠল কবিতায় ,

" হে বঙ্গ , ভান্ডারে তব বিবিধ রতন ;

তা সবে , ( অবোধ আমি ) অবহেলা করি, 

পরধনলোভে মত্ত করিনু ভ্রমণ

পরদেশে , ভিক্ষাবৃত্তি কুক্ষণে আচরি

কাটাইনু বহুদিন সুখ পরিহরি, 

অনিদ্রায়, নিরাহারে সঁপি কায় মনঃ , 

মজিনু বিফল তপে অবরণ্যে বরি ......

কবি অমরতা প্রার্থনা করলেন বঙ্গজননীর কাছে । নিজের জন্য নয় । কবিতার জন্য ।

" তবে যদি দয়া কর  ভুলি দোষ গুণ ধর

অমর করিয়া বর দেহ দাসে সুবরদে ...."

বাঙালি পাঠককুল  সাদরে বরণ করে নিল মাইকেলকে । নবীন কবিরা অনেকেই মাইকেলকে অনুসরণ করে কবিতা লিখতে শুরু করলেন ।


রবীন্দ্রনাথের আগমনের পর বাংলা কবিতা হয়ে উঠল সহজ , সরল ।  পূর্বের সকল ধারা ভেঙে

রবীন্দ্রনাথ  নিজস্ব রীতিতে , নিজস্ব কাব্যভাষা নিয়ে পৌঁছে গেলেন বাঙালি পাঠকের হৃদয়ে । তাঁর কবিতা , গান , গল্প , উপন্যাস বাঙালি পাঠকের নিত্য চর্চার বিষয় ।  মোহিতলাল  , ডি এল রায়ের মত কেউ কেউ সেইসময় রবীন্দ্র বিরোধীতা করলেও তাঁর হাত ধরেই বাংলা কবিতা পৌঁছে গেল আন্তর্জাতিক দরবারে ।  এশিয়ার প্রথম কবি হিসাবে রবীন্দ্রনাথ জয় করলেন নোবেল পুরষ্কার।  রবীন্দ্রনাথের হাত ধরে আজও চলছে বাঙালির নিরন্তর সাহিত্য সাধনা । কবিতা নিয়ে ঝড় উঠেছে । বিতর্ক হয়েছে বারেবারে । সমালোচনা হয়েছে ।  রবীন্দ্র বিরোধীতা হয়েছে ।  তিরিশের দশকেও একদল  রবীন্দ্র বিরোধীতা করে অন্যধারার কবিতা লিখতে শুরু করলেন । সুধীন্দ্রনাথ দত্ত , জীবনানন্দ দাস , বুদ্ধদেব বসু , অমিয় চক্রবর্তী , বিষ্ণু দে ছিলেন এই দলে ।  সাধারণ পাঠক কিন্তু তাঁদের সেইভাবে  গ্রহণ করলেন না । তাঁদের কপালে জুটল দুর্বোধ্য কবির তকমা । যুদ্ধোত্তর পৃথিবীতে বিশ্বব্যাপী কবিতা ও সাহিত্যের যে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছিল ইংরেজি সাহিত্যের অনুরাগী এই কবিদের লেখায় তার প্রভাব পড়েছিল। সাধারণ পাঠক তখন ইংরেজি কবিতার সাথে তত  সম্পৃক্ত ছিলেন না । ফলতঃ তাঁদের কবিতা পাঠকের হৃদয় স্পর্শ করতে পারেনি ।  কবিতা নিয়ে অনেক সময় বিতর্কের ঝড় উঠেছে । সমালোচনা হয়েছে । প্যারডি হয়েছে । বাংলা কবিতায় উদয় হয়েছে হাংরি জেনারেশনের । অন্তমিল ছেড়ে কবিতা মুক্ত পাখির মত আকাশে ডানা মেলেছে । কিন্তু কবিতা কখনো থেমে থাকেনি ।   কখনো আনন্দে বিহ্বল , কখনো বিরহ কিংবা শোকে কাতর । আবার শানিত তরবারির মত  কখনো  ঝলসে উঠেছে তাদের কলম । কোন শক্তির কাছে তারা মস্তক বিক্রি করেননি । সময় অনেক পাল্টে গেছে কিন্তু বুকের মাঝে কবিতার ওম,  সেটা নষ্ট হয়নি।  বাঙালি আজও কবি । কবিতা লেখেনি আর প্রেমে পড়েনি এমন বাঙালি এই ২৬সেও খুঁজে পাওয়া ভার ।


সময় বদলেছে । আবার একদল নতুন কবি উঠে এসেছেন । তাদের মধ্যে শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সুনীল গাঙ্গুলী, সুভাষ মুখোপাধ্যায় , নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী , পূর্ণেন্দু পত্রী, তারাপদ রায় তাদের সহজ ভাষা দিয়ে বাংলা কবিতাকে আবার পৌঁছে দিলেন বাঙালি পাঠকের হৃদয়ে । সুনীল শুধু কবিতার জন্য অমরত্বকে তাচ্ছিল্য করেছেন তাঁর কবিতায় । শঙ্খ ঘোষ , জয় গোস্বামী, সুবোধ সরকার , শ্রীজাত প্রমুখর  সহজ ভাষায় লেখা কবিতাগুলি  পাঠকের হৃদয়ে স্থান করে নিল । জয় গোস্বামী বা সুবোধ সরকারকে বিশেষ একজনের স্তুতির জন্য আমরা  যতই  সমালোচনা করিনা কেন , বাংলা কবিতাকে তাঁরা যে উচ্চতায় তুলে নিয়ে গেছেন , তারজন্য বাঙালি পাঠকের অবশ্যই তাঁদের কাছে কৃতজ্ঞ থাকা দরকার । যতই সমালোচনা করি আমি কখনো তাঁদের গো ব্যাক বলতে পারবোনা । 

জয় গোস্বামীর ছোট্ট একটি কবিতা মনে পড়ছে । কবিতাটির নাম "অপেক্ষা"

যতবার বেল বাজে

    ভাবি তুমি এলে


দরজা খুলে দেখি অন্য কেউ


মনে ঢেউ ওঠে, মনে

   মরে যায় ঢেউ।


বাংলা কবিতার আলোচনা করতে গেলে ওপার বাংলার কবিদের কথা অবশ্যই উল্লেখ করতে হবে । না হলে প্রতিবেদন অসম্পূর্ণ থেকে যাবে । ওপার বাংলার কবি , যারা বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে অনেক ঝড়ঝাপটার মধ্য দিয়ে উর্দ্ধে তুলে ধরেছেন , নানান প্রতিকূলতার মধ্যেও উড়িয়ে দিয়েছেন বিজয় নিশান , তাঁদের মধ্যে অগ্রণী কয়েকজন হলেন শামসুর রহমান, মোহম্মদ রফিকুজ্জামান, রফিক আজাদ, হেলাল হাফিজ, নির্মলেন্দু গুণ, মহাদেব সাহা , রুদ্র মহম্মদ এবং আরো অনেকের সাথে অবশ্যই তসলিমা নাসরিনের নাম উল্লেখযোগ্য।  আজ যখন ধর্মের নামে উন্মত্ত হয়ে উঠেছে দুই দেশের মৌলবাদী শক্তি , কোথাও হিন্দি কোথাও উর্দুর  জয়গান শোনা যাচ্ছে,  সেই দুঃসময়েও পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের বাঙালিরা , যারা স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রেখেছেন , কবিতায় , গানে , সাহিত্য সৃষ্টির মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষাকে এগিয়ে নিয়ে চলেছেন, তাদের প্রতি রইল  আমার অন্তরের শ্রদ্ধা এবং নমস্কার। ভাবলে ভাল লাগে আজও বাঙালি স্বপ্ন দেখেন । আজও বুকের উষ্ণতা দিয়ে রচিত হয় কবিতা । বাংলা ভাষার এখানেই সার্থকতা । কেউ গলা টিপে মারতে চাইলেও তাকে মারা যাবেনা । ঝড় বন্যা মহামারী কিংবা রাষ্ট্র বিপ্লবে বাঙালি হারিয়ে যায়নি । ইট চাপা ঘাসের মত সে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে ।  বাঙালির মুখের ভাষা আর বুকের মাঝে সযত্নে লালিত কবিতা কেউ কেড়ে নিতে পারেনি । ভবিষ্যতেও পারবে না । বাঙালি বেঁচে থাকবে তার অসাম্প্রদায়িক চরিত্র নিয়ে । ধর্মের বেড়া ভেঙ্গে বেড়িয়ে আসবে বাঙালি । বুকের মাঝে রবীন্দ্রনাথ আর নজরুলকে নিয়ে সহস্র বছর ধরে রয়ে যাবে বাংলা কবিতা ।


নিজের কথা দিয়ে শেষ করি । আমার লেখালেখি শুরু হয়েছিল কবিতা দিয়ে । সেও পঞ্চাশ বছর হয়ে গেল ।তার আগে কী লিখেছি , কিছু লিখেছিলাম কিনা আজ আর মনে নেই। কোথাও আজ তার কোন অস্তিত্ব নেই । ৭৫ সালে সংঘের দেয়াল পত্রিকা প্রকাশিত হয়েছিল সেখানেই প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল কবিতা । আগের রাত্রি প্রায় বিনিদ্র কাটল । মাথার মধ্যে উঁকিঝুঁকি মারতে লাগল শব্দেরা । তারপর একসময় প্রেমিকার মত ধরা দিল বাহুবন্ধনে । সকালে উঠে লিখলাম কবিতা । আমার লেখা প্রথম কবিতা। তার প্রথম দুটি লাইন,

" অন্ধকারে জেগে আছি একা 

চারিদিকে নৈঃশব্দ

মাথার ভিতর ঘূনপোকা কুরে কুরে খায়......

 কবিতার বাকি অংশ আর মনে নেই। স্মৃতি থেকে হারিয়ে গেছে । তার কোন কপিও নেই আমার কাছে । কালের নিয়মে হারিয়ে গেছে । তারপর দু'একবার যে কবিতা লেখার চেষ্টা করিনি তা নয় । করেছি । কিন্তু বৃথা চেষ্টা। সেগুলো আর যাই হোক , একটিও কবিতা হয়ে ওঠেনি। শব্দেরা লুকোচুরি খেলে আমার সাথে । যখনই ধরতে গেছি লুকিয়ে পড়েছে অন্ধকারে । আর খুঁজে পাইনি । শেষে যা দাঁড়িয়েছে সেটা আর যাই হোক কবিতা নয় , রংমিলান্তি ।


তবে আজও কোন পূর্ণিমা রাতে জ্যোৎস্নার প্লাবনে যখন চরাচর ভেসে যায় , বাতাসে মিষ্টি ফুলের গন্ধ  মন উতলা হয়ে ওঠে কবিতার জন্য । কিংবা বর্ষা মুখরিত  কোন শ্রাবণ সন্ধ্যায় শব্দেরা যখন উঁকি মারে মস্তিষ্কের কোষে  আমি  চেষ্টা করি সার্থক একটি কবিতা লেখার জন্য । মনে হয় ,

"শুধু কবিতার জন্য এই জন্ম 

শুধু কবিতার জন্য এই খেলা ,

শুধু কবিতার জন্য একা এই হিম সন্ধ্যেবেলা 

ভুবন পেরিয়ে আসা শুধু কবিতার জন্য "

                            (সুনীল গাঙ্গুলী)