প্রবীর মণ্ডল -র কথা ক্যানভাস

কবিজন্ম

 আমাদের কবি-জন্ম‚ সৌরভের 'কবিজন্ম'


প্রবীর  মণ্ডল 




আমার কিশোরবেলার বন্ধু সৌরভ চ্যাটার্জি — তখন আমরা বিভিন্ন কলেজে  পড়তাম। সৌরভ, আমি, অমিতাভ, কিশোর, প্রবীর, অরুণ, অনির্বান দাস—আরো অনেকেই খুব ভালো বন্ধু ছিলাম। মজার কথা, সেই সময় থেকেই ও একটা পত্রিকা সম্পাদনা করত। সেই পত্রিকার নামই ছিল ‘কবিজন্ম’। কী মিষ্টি একটা নাম। সেই দিন থেকেই যেন আমাদের কবি জন্ম শুরু হয়েছিল। ‘কবি জন্ম’-র ক্ষেত্রে আমাদের একটা প্রক্রিয়া ছিল। পরিক্রমা ছিল। পরীক্ষা নিরীক্ষা ছিল। আমরা সবাই আন্তরিকভাবে বন্ধুদের মধ্যে একটা সম্পর্ক তৈরি করেছিলাম সাহিত্যের বন্ধনের মধ্য দিয়ে। কিন্তু সেই সময় আর আজকের মধ্যে বিরাট একটা ব্যবধান তৈরি হয়েছে। আজকে যারা লিখতে আসছেন, তারা কোনোভাবেই আর নিজেদের তৈরি করেন না। নিজেদের তো তৈরি করতে হয়, বিশেষত লেখার জন্য, পড়াশোনার মাধ্যমে। একটা কবিতা লিখতে গেলে কবিতার জন্য যে অধ্যবসায় লাগে, সেই অধ্যবসায় এখন আর অনেকের মধ্যেই দেখা যায় না। তাছাড়া তারা বাংলা সাহিত্য বা বিদেশী সাহিত্য নিয়ে তেমন চর্চাও করেন না।


সেই সময় আমরা যারা লিখতে এসেছিলাম, কোথাও একটা আমাদের মধ্যে আন্তরিক ভালোলাগার জায়গা ছিল। আমরা পড়াশোনা করতাম, প্রিয় কবিদের কবিতার বই পড়তাম। পড়াশোনার মধ্য দিয়েই নিজেদের তৈরি করেছিলাম। আজকের যারা লিখতে এসেছে, তাদের অনেকেই কেমন যেন দলছুট হয়ে গেছে। তারা ঠিক আর এই লেখালেখির মধ্যে আনন্দ খুঁজে পায় না। যেকোনো শিল্পের ক্ষেত্রে, সৃষ্টির ক্ষেত্রে, আমাদের যখন কাজ করতে হয়, তখন একটা গভীর মগ্নতার দরকার হয়। কিন্তু এখন যারা লিখতে আসছে, তাদের মধ্যে সেই মগ্নতা নেই। তাদের মধ্যে কবিতা বিষয়ে কোনো পড়াশোনা নেই। এমনকি বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে দেখা যায় অজস্র পত্রিকা জন্মাচ্ছে। যারা সম্পাদনা করতে আসছেন, তাদের মধ্যে একজন সম্পাদক হিসেবে যে বোধ থাকা দরকার—একজন কবিকে বুঝে নেওয়ার জন্য, একজন লেখককে বুঝে নেওয়ার জন্য, সেই বোধ এখনকার প্রায় অধিকাংশ সম্পাদকের মধ্যেই দেখা যায় না। কোথাও একটা সম্পাদনা করতে এসেছেন, যেন পত্রিকা করে নিজের নাম গড়বেন, অথবা আলতুফালতু, ভুলভাল লেখা ছেপে তাদের কাছ থেকে পত্রিকা বিক্রি করে মুনাফা বা অর্থ উপার্জন করবেন। ফলে সম্পাদনা সাহিত্যিক দায়িত্ব না হয়ে অনেকের কাছে লক্ষ্য বা 'টার্গেট' এ পরিণত হয়েছে। আর আজকের যারা লিখতে এসেছে, তাদের অনেকেই সেই গভীর মগ্নতা বা শিল্পের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ধৈর্য খুঁজে পায় না।


আমি তখন দুর্গানগরে আমার দাদা কবি সুবীর মণ্ডলের কাছে থাকতাম। দাদার সম্পাদনায় ২০০০ সালে 'কবীর'পত্রিকা তৈরি হয়। তখন তো আর হোয়াটসঅ্যাপ, মেসেঞ্জারের যুগ নয়। আমরা কবিদের বাড়িতে গিয়ে কবিতা আনতাম। দাদার সূত্রেই মণীন্দ্র গুপ্ত, আলোক সরকার, রমেন্দ্রকুমার আচার্যচৌধুরী, অমিতাভ দাশগুপ্ত, রণজিৎ দাশ, মৃদুল দাশগুপ্ত, পার্থপ্রতিম কাঞ্জিলাল এর মতো কবিদের সঙ্গে আমার সেই সময় থেকেই পরিচয় তৈরী হয়। সেই যোগাযোগ থেকে আড্ডা, সাহিত্য আলাপ, আর কবিতার ভাব বিনিময় হতো। এইভাবে আমরা তাঁদের সান্নিধ্যে তাঁদের কবিতা পড়তাম, শিখতাম, আর নিজেদের তৈরি করতাম। দাদা বাংলা সাহিত্য নিয়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম.এ. পড়েছে। পরে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভাষাতত্ত্ব নিয়ে 'বাংলা লিপির উদ্ভব ও ক্রমবিকাশ' নামে বই লিখেছে। দাদা কবি সুবীর মণ্ডলের কবিতা নিয়ে গভীর পড়াশুনা ছিল, আর সেই বোধ আমার মধ্যেও জারিত হয়। আমিও বাংলা কবিতার সঙ্গে এক চূড়ান্ত পাগলের সম্পর্ক তৈরি করে ফেললাম। খাওয়া-দাওয়া ভুলে গিয়ে রাত জেগে কবিতার সঙ্গে বসে থাকতাম। সহবাস করতাম। আমার জীবনে সবচেয়ে বড় লক্ষ্যই কবিতার সঙ্গে বসবাস করা, কবিতার জন্য নিজেকে সবসময় জাগিয়ে রাখা। এখনো সেই একই রকম পাগলামি অনুভব করি প্রায় ৩০ বছর পেরিয়ে এসেও। কবিতাই আমার কাছে সব থেকে বড় সঙ্গী, যার জন্য আমি রাত জেগে থাকতে পারি, জীবন কাটিয়ে দিতে পারি।


যেভাবে আমাদের সেই কিশোরবেলার বন্ধুরা আজও একইভাবে পথ হাঁটছে, পথ হাঁটছে আমার সেই কবিজন্মের বন্ধু সৌরভ। সৌরভের সৌরভ ছড়িয়ে পড়ুক বাংলা কবিতার আকাশে এই স্বপ্ন দেখি আমি।


ঠিক এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে এমিলি ডিকিনসনের একটি কবিতার এই লাইনগুলো আরও একবার পড়ে নিতে ইচ্ছে করছে : "I dwell in Possibility— A fairer House than Prose— More numerous of Windows— Superior— for Doors— Of Chambers as the Cedars— Impregnable of Eye—"


বাংলা অনুবাদ করলে দাঁড়ায় ---  " আমি সম্ভাবনার মধ্যে বাস করি— গদ্যের চেয়ে আরও সুন্দর এক ঘরে, যার জানালা আরও অসংখ্য, দরজাগুলি আরও মহিমান্বিত।

কক্ষগুলি যেন দেবদারু গাছের মতো— চোখের দৃষ্টির কাছে দুর্ভেদ্য।"