সায়ন্তনী ভট্টাচার্য-র কবিতা
বর্ষায় অপসৃয়মান
১
ফুরিয়ে যাওয়াই যায়। সময়ও এমন। সংবাদপত্রে লেখা হবে ধমনীর ছলাৎছল, বাড়ির ঠিকানা। মস্ত একখানা কিছু না বাগানে ঘুরে-টুরে বলবে 'মানে নেই।' আমরা যাব দামোদর-মুণ্ডেশ্বরীর মোহনায়, দেখব বাঁশের সাঁকো, বাইক পেরোচ্ছে নদী। যারা রোজ নদী পেরোয় 'মানে নেই' তাদের খুব কিছু করতে পারে না। ফিরে আসবার সময় ক্লান্ত লাগে, জ্যামে আটকে থাকে, ঘোষণায় বলে আর অল্প গেলেই এমন একখানা তাকানো হবে যাতে চাঁদ টলে যায়। সে ভুল শহরে ঢুকে পড়ে, শেষে না কথা হয়, হ্যাঁ কথা হয়, শাখামূল প্রশাখামূলে নোনা জল লাগে, মেঘলা নিয়ে আসে বাজার থেকে, ঢেউয়ের গান। কোনোভাবে বাড়ি পৌঁছলেই সব ঠিক হয়ে যাবে মনে হয়। কুয়াশার নিয়ম মেনে নির্জনের কাছে দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর ফেরিঘাট, রাতচরা প্রজাপতি, তার হলুদ রং, ঈশ্বর কোলাপসিবল গেট খুলে দেন, বড্ড নরক লাগে।
২
এবং অন্ধকারে অন্ধকারের কথা না বললে অক্সিজেন কমে আসে, তোমার বাড়ির দরজার বাইরে থামা যায় না আর চিরহরিৎ পাতা ঝরায়। শীত চলে গেছে। শীত জলছবিতে মুখ লুকোচ্ছে। ফাল্গুন তোমার নাম নয়, ঘুম তোমার ছোঁয়া নয় আর আমাদের কোনো কথা নেই বলে পথে ময়ূর নেই, ময়ূরের পেখম নেই। ওসব নীলচে সবুজ রঙে আমরা লুকাতে চেয়েছি হাঁটুর ব্যথা, তামাটে চোখের ভুল। খুব তাড়াহুড়ো করে তুমি হাত-মুখ ধুচ্ছো, রাত নরম হয়ে আছে, তারপর ধূসর, তারপর অনেক হলুদ...
৩
আমি ভাত-ডালে ঘুমোতে যাই, জেগে উঠি। শেষ রূপকথার পাশে চুপচাপ দাঁড়িয়ে ভাবি একটু পরেই পাতালরেলে সূর্য উঠবে, সে দমদম থেকে সরোবর বেড়াতে যাবে। দ্যাখো, আমার হাড়-মজ্জায় মাটি। সে বেলফুল ফোটাচ্ছে রাত হলে, সাদা হচ্ছে খুব, হালকা হচ্ছে পায়রার মতো। আমার হলুদ বাড়ির দেয়ালে ভেজা ভেজা আগুন জ্বালাচ্ছে! একটু পরেই সব ঠিক হয়ে যাবে, এমনভাবে উঠোনে আলপথ আঁকছে। তারপর ধানমাঠ, শিউলি ফুল। আঁচ এখনো অল্প অল্প দুলছে, হাওয়ায় নুয়ে পড়ছে। এসব ধক্কাবাজির দিন, বুকের বিকেল খোলা ম্যাজিকের দিন। আর ওড়নায় সোনালি জরির কাজ, নীল চুমকি।
এমন সময় অসম্ভব টাঙ্গা চড়ে দূর থেকে এলো
৪
সহজে ভেঙেছে রাত্রি, খাঁচা-টাচা প্রশস্ত হল। শেষে ভিড় গড়িয়ে দেখা গেল ভেসে যাচ্ছে। আমি মস্তিষ্ক রেখেছি জটিল মাটিতে, আর যা আছে তা এতই অসহ্য যে রাখাই যাচ্ছে না। হৃদরোগে উড়ছে সময়। আর তার বিহ্বল ঐতিহাসিক স্থান, টাঙ্গা চড়ে দূরে আসা যায়, একটু তাকালেই চোখ, তার হাসিকান্না। উঠেছে নগরবিভা পাখি। উড়েছে। কী হবে আমার ধীরে ধীরে শীত হয়ে গেল। বহুদূর গেলে তবে চরণকমলেষু আলো। আহা জীবনের রুটি-সবজি হয়ে চলেছে আর গালিচা বাহারি, এমব্রয়ডারি করা। দিন, এসময় খুব নাছোড়বান্দা হল। কুপিয়ে কাটবে কতকাল। সরল ঝরে পড়ে। এইবার কান্না নাও কিছু।
৫
যার কোনো মানে নেই তেমন একখানা দিন... এসো, তোমার সময় দেখি, তোমার উদাসীন নক্ষত্রের কাঁধে মাথা রাখি। যার তুমি নেই, আমি নেই, তার কী আছে? এসব অল্প আঘাত, তোমার বুক জ্বলে যাচ্ছে, হালকা আগুনে তুমি ছোট হচ্ছ... ছাই এবং সন্ধ্যা হলো। এখনো যামিনী ঢের। তুমি টের পেলে দেয়ালে নতুন রং, অন্ধকার পিঠে পা রাখছে, তুমি টের পেলে ছেড়ে যাওয়াই যায়, পৃথিবীর নীলে অতখানি মায়া... তোমার সময় নেই। মাছের আঁশের মতো অবান্তর এসব দিন, আমাদের দিন... আমাদের কিছু নেই মাটি ছাড়া, ধুলো ছাড়া। আমরা গাছ বসাবো, কাঁদব, হাসব, চুমু খাব, এটুকু অন্তত আমরা আমাদের ইচ্ছে মতো করতে পারি!