দেবোপমা চৌধুরী-র কবিতা

কবিজন্ম

 দেবোপমা চৌধুরী-র কবিতা


পৃথিবীর ওপারের আলো



নরওয়ের উত্তরে, ট্রমসোর নিঃশব্দ রাতে,

বরফঢাকা পাহাড়েরা দাঁড়ায় প্রহরীর মতো,

হ্রদের কালো আয়নায় জমে থাকে শীতের নিঃশ্বাস,

মাইনাস তাপমাত্রার কাঁপুনি ছুঁয়ে যায় অস্থিমজ্জা।


চিলিং হাওয়া, ঝিরিঝিরি বৃষ্টি,

চারপাশে তুষারের সাদা রাজত্ব—

হাতে ধোঁয়া ওঠা কফি, আগুনে পোড়া মার্শম্যালো,

বারবিকিউ করা হটডগের গন্ধে উষ্ণ হয়ে ওঠে রাত।


অপেক্ষা… আরও অপেক্ষা…

যেন মহাবিশ্বের মঞ্চে পর্দা উঠবে বলে।

সূর্যের বুক থেকে ছুটে আসা কণারা

অক্সিজেন আর হাইড্রোজেনের সঙ্গে মিশে

লিখে চলে আলোর গোপন রসায়ন।


হঠাৎ—

আকাশ যেন রঙের পিচকারি হাতে হোলি খেলতে নামে!

সবুজ, হলুদ, গোলাপি, লাল—

রঙ ছিটকে পড়ে দিগন্ত থেকে দিগন্তে।


তারপর শুরু হয় নৃত্য।


সবুজ আলোর সরু ফিতা

লাফিয়ে ওঠে আকাশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে,

কখনও ঘুরপাক খায় নাগিনীর মতো,

কখনও দুলে ওঠে সাগরের ঢেউ হয়ে,

কখনও বা বৃত্ত এঁকে নেমে আসে মাথার ওপর।


মনে হয়, পৃথিবী আর আকাশের মাঝখানে

আমি এক ক্ষুদ্র বিস্ময় হয়ে দাঁড়িয়ে আছি—

যেখানে সময় থেমে যায়,

শব্দ হারিয়ে যায়,

শুধু আলো কথা বলে।


সেই মুহূর্তে বুঝি—

বরফ, বৃষ্টি, হাড়কাঁপানো শীত,

দীর্ঘ প্রতীক্ষা, অনিশ্চয়তার পথচলা—

সবই সার্থক।


কারণ প্রতিদিন তো আর দেখা যায় না

আকাশকে এভাবে রঙে রঙে মাততে,

প্রতিদিন তো আর দেখা যায় না

মহাবিশ্বকে নিজের হাতে আঁকতে।


অরোরা যখন নাচে,

ট্রমসোর রাত তখন আর রাত থাকে না—

সে হয়ে ওঠে স্বপ্নেরও ওপারের এক জগৎ,

যেখানে আলোই একমাত্র ভাষা,

আর বিস্ময়ই একমাত্র সত্য।





শেষ বাঁশির আগে



হয়তো এটাই শেষ বিশ্বকাপ…

শেষবারের মতো

সবুজ ঘাসে ছুটবে একেকটা ইতিহাস,

শেষবারের মতো

স্টেডিয়াম গর্জে উঠবে একেকটি নাম ধরে।


রোনালদো—

সময়ের সীমানা ছুঁয়ে দাঁড়ানো এক পর্বত,

আজও দৌড়ায়,

তবু ক্যালেন্ডার নীরবে বলে,

“সব ম্যাচেরই শেষ বাঁশি বাজে…”


মদ্রিচের পায়ে এখনও

ক্রোয়েশিয়ার স্বপ্নের নকশা,

কিন্তু সময়ের ঘড়ি

সোনালি চুলে এঁকে দিয়েছে বিদায়ের রেখা।


লুকাকুর শক্তিশালী পদক্ষেপ,

বেলজিয়ামের লাল জার্সিতে

আর কতবার গর্জে উঠবে?

উত্তর জানে শুধু ভবিষ্যৎ।


আর যদি…

মেসিও বলেন,

“এবার তবে সত্যিই শেষ”—

তবে ফুটবল কি আর

আগের মতো থাকবে?


আমরা বড় হয়েছি

এই নামগুলোর সঙ্গে,

তাদের গোলে চিৎকার করেছি,

তাদের হারেও

চোখের কোণে জমেছে অদৃশ্য জল।


একদিন

নতুন নায়কেরা আসবে,

নতুন উল্লাসে ভরে উঠবে গ্যালারি।

তবু কিছু নাম

পরিসংখ্যান নয়,

তারা এক একটি যুগ।


শেষ ম্যাচের পর

জার্সি খুলে যখন

তারা হাত নাড়বে দর্শকদের দিকে,

আকাশে হয়তো কোনো ট্রফি থাকবে না,

তবু কোটি মানুষের হৃদয়ে

তাদের জন্য দাঁড়িয়ে থাকবে

অশেষ করতালি।


কারণ কিংবদন্তিরা অবসর নেন,

কিন্তু কিংবদন্তিরা

কখনও মাঠ ছেড়ে যান না।

তারা থেকে যান—

প্রতিটি শিশুর প্রথম ফুটবলে,

প্রতিটি গোল উদযাপনে,

প্রতিটি বিশ্বকাপের অপেক্ষায়।