কবির চোখে কবির দর্শন : প্রসঙ্গ তাপস রায়ের গদ্যভাবনা

কবিজন্ম

 কবির চোখে কবির দর্শন : প্রসঙ্গ তাপস রায়ের গদ্যভাবনা

মোঃ আফরুক সেখ

গবেষক, বিনোদ বিহারী মাহাত কয়লাঞ্চল বিশ্ববিদ্যালয় 


পৃথিবীর সুদীর্ঘ প্রাকৃতিক ও জৈব বিবর্তনের পথ ধরে জীবনমঞ্চে যেদিন মানবচেতনার প্রথম উন্মেষ ঘটেছিল, তখন থেকেই মানুষের চিন্তাজগতে দুটি প্রধান অভিমুখের সৃষ্টি হয়— জ্ঞান ও রস। এই দ্বিমুখী চেতনার নিরিখেই সাহিত্য মূলত দুটি ধারায় বিভক্ত: মানবিক আবেগনির্ভর সৃজনশীল বা রসসাহিত্য (যেমন—উপন্যাস, ছোটোগল্প) এবং বৌদ্ধিক বিকাশনির্ভর মননশীল বা প্রবন্ধ-সাহিত্য। দর্শন, বিজ্ঞান কিংবা সমাজচিন্তার যাবতীয় সূক্ষ্ম প্রক্রিয়া মূলত গদ্যরীতির ওপর ভিত্তি করেই বিকশিত হয় এবং তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করা মানুষের এক সহজাত প্রবৃত্তি। অন্যান্য সৃজনশীল সাহিত্যে পাঠকের সঙ্গে লেখকের একটি প্রচ্ছন্ন আবরণ থাকলেও, প্রবন্ধে লেখক সম্পূর্ণ প্রত্যক্ষ ও অনাবৃতভাবে তাঁর জ্ঞানগর্ভ ভাবনা প্রকাশ করেন। প্রবন্ধের বিষয়বস্তু যাই হোক না কেন, তার প্রকাশভঙ্গির যুক্তিনিষ্ঠতা তাকে বিজ্ঞানমনস্কতার পাশাপাশি শিল্পের মর্যাদাও দান করে। প্রবন্ধের এই গঠনগত ও তাত্ত্বিক স্বরূপটি সুনিপুণভাবে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বিশিষ্ট সমালোচক ড. শশিভূষণ দাশগুপ্ত বলেছেন— “কোন রচনার সকল অংশ ও উপাদান যখন কোনও একটা প্রকৃষ্ট বন্ধনের ভিতর দিয়া পরস্পর অন্বিত হইয়াছে এবং একটা সমগ্রতা লাভ করিয়াছে তখনই তাহা প্রবন্ধ আখ্যা লাভ করিয়াছে। …………খাঁটি সাহিত্যের ক্ষেত্রে এই বন্ধন বহু রকমের হইতে পারে। অন্যান্য ক্ষেত্রে তথ্যের সহিত তথ্যের পরস্পর অন্বয় এবং পারম্পর্য, যুক্তির সহিত যুক্তির অন্বয় এবং পারম্পর্য—এবং তথ্য ও যুক্তির পরস্পর অন্বয়—এবং সকল জুড়িয়া শেষ পর্যন্ত একটি সুসঙ্গত সিদ্ধান্তে গমন—ইহাই প্রবন্ধের বিশিষ্ট লক্ষণ।”১

বাংলা প্রবন্ধ-সাহিত্য তার আঙ্গিক ও প্রকরণশৈলীর বিবর্তনে এক সুদীর্ঘ পথ অতিক্রম করেছে। ইংরেজি ‘Essay’-র প্রত্যক্ষ প্রভাবে আধুনিক বাংলা প্রবন্ধের উদ্ভব হলেও, এর শিকড় অনেক গভীরে। ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাত ধরে বাংলা গদ্যে প্রবন্ধের একটি প্রাথমিক অবয়ব তৈরি হলেও, তা ছিল মূলত ধর্ম, সমাজ-সংস্কার এবং শাস্ত্রীয় তথ্যনির্ভর। শাস্ত্রীয় নজিরের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতার কারণে সেই সময়কার প্রবন্ধে সুনির্দিষ্ট শিল্পরূপ বা সাহিত্যের প্রাণের অভাব ছিল। বাংলা সাহিত্যে প্রবন্ধের এই বিবর্তনের রূপরেখা তুলে ধরতে গিয়ে প্রাবন্ধিক অতুলচন্দ্র গুপ্ত বলেছেন— “বাংলা সাহিত্যে প্রবন্ধ সাহিত্য হয়ে উঠেছে বঙ্কিমচন্দ্রের হাতে। রচনার অনতি-পরিসর বন্ধনের মধ্যে কোনো বিষয়ে লেখকের বক্তব্যের আলোচনা ও মীমাংসার প্রকাশ প্রবন্ধের মূল অর্থ ও আদি রূপ। বঙ্কিমচন্দ্রের পূর্বে ও তাঁর সমকালে বাংলায় প্রবন্ধের রূপ ছিল মোটের উপর এই অনলংকৃত আদি রূপ-রামমোহন রায়ের ধর্মালোচনায়, বিদ্যাসাগর মহাশয়ের সমাজসংস্কারের তর্কবিতর্কে, ভূদেব মুখোপাধ্যায়ের পারিবারিক ও সামাজিক প্রবন্ধগুলিতে। বঙ্কিমচন্দ্র যখন নানা রচনার মধ্যে প্রবন্ধরচনায় হাত দিলেন তখন তাঁর সাহিত্যের সোনার কলমে প্রবন্ধের মধ্যে এল বক্তব্যের অতিরিন্ত উপরিপাওনা, যাতে রচনা হয় সাহিত্য। প্রবন্ধ সাহিত্য হয়ে উঠল। সেই অবধি বাংলায় সাহিত্যধর্মী প্রবন্ধের চলন হয়েছে………।”২ বঙ্কিমচন্দ্র ও তাঁর ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকার হাত ধরেই বাংলা প্রবন্ধ প্রাচীন শাস্ত্রীয় নজিরের গণ্ডি ভেঙে একান্তভাবেই লেখকের নিজস্ব অনুভূতি, আত্মোপলব্ধি ও চিন্তন-মননকে আপন করে নেয় এবং বিচিত্র বিষয়ের এক সুনির্দিষ্ট ও সুসংবদ্ধ শিল্পরূপে আত্মপ্রকাশ করে। 

একালের বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক তাপস রায়ের মননশীল রচনার একটি বড়ো অংশজুড়ে রয়েছে বাঙালি কবি ও তাঁদের কবিতাযাপন। পেশাগতভাবে কেন্দ্রীয় সরকারের আধিকারিক এবং ইতিহাসের গবেষক হলেও, তাঁর আত্মিক প্রশান্তির মূল আশ্রয় শিল্প ও সাহিত্যচর্চা। নিজে কবি হওয়ার সুবাদেই অত্যন্ত দরদি ও মানবতাবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে তিনি সমকালীন কবিদের অন্তর্লীন সংকট, অপ্রাপ্তি ও জীবনসংগ্রামকে তাঁর ‘মিথ্যে মিথ্যে কবিতা’ (জুন ২০১৭, সুতরাং পাবলিশার্স) প্রবন্ধগ্রন্থে নিপুণভাবে তুলে ধরেছেন।

মোট ২২টি প্রবন্ধ সংবলিত এই গ্রন্থে ত্রিশ ও পঞ্চাশের দশকের প্রতিষ্ঠিত-অপ্রতিষ্ঠিত বহু কবির কথা উঠে এসেছে, যাঁরা যোগ্য মূল্যায়নের অভাবে কিংবা প্রত্যাশা পূরণের ব্যর্থতায় ভুগেছেন। অতীত ও বর্তমানের কবিদের এই টানাপোড়েন এবং সময়ের সাথে সাথে কবিতাচর্চার বহুমাত্রিক রূপান্তরই এই গ্রন্থের মূল উপজীব্য।

এই গ্রন্থের প্রবন্ধ-বিন্যাসে একটি সচেতন অভিনবত্ব লক্ষ করা যায়। প্রথাগত কালানুক্রম অনুসরণ করে সর্বজ্যেষ্ঠ রবীন্দ্রনাথকে শুরুতে না রেখে, প্রাবন্ধিক গ্রন্থটির সূচনা করেছেন শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের আলোচনা দিয়ে। প্রচলিত ঘরানা ভেঙে সূচিপত্র সাজানোর এই ব্যতিক্রমী প্রয়াস প্রবন্ধ সংকলনটিকে অনন্য মাত্রা দিয়েছে। আলোচ্য অংশে এই গ্রন্থের মোট ২২টি প্রবন্ধের মধ্য থেকে প্রথম ৫টি প্রবন্ধের নিরিখে তাপস রায়ের দর্শন-রীতি ও গদ্যভাবনার সংক্ষিপ্ত মূল্যায়ন করা হলো—

সংকলনের প্রথম প্রবন্ধ ‘মিথ্যে মিথ্যে কবিতা’তে দেখি এ জগতকে মায়াময় বলা হয়েছে। এ জগত মিথ্যাময়ও। বিশেষ করে আমাদের এ উপমহাদেশ। মিথ্যা খুব সহজ জিনিস, এর তাত্ক্ষণিক লাভের পরিমাণও নেহাত খারাপ নয়। সে কারণেই আমাদের সমাজে মিথ্যা কথা বলা হয় শ্বাসপ্রশ্বাস নেওয়ার মতো, না বললে যেন বাঁচা কঠিন। তাই গদ্যকার তাপস রায় প্রবন্ধের প্রথমেই দেখালেন কীভাবে মিথ্যা দিয়ে শিল্প রচনা হয় অর্থাৎ এক্ষেত্রে তিনি শিল্প মানে শুধুমাত্র কবিতাকেই বোঝাতে চেয়েছেন। এক্ষেত্রে তিনি ইংরেজ কবি অ্যান ওয়াল্ডম্যানের কবিতার যে  উদাহরণ দিয়েছেন তা হলো — 

“শিল্প শুরু হয় মিথ্যায়

বিচ্ছিন্নতা হল তুমি তার সাথে আমি আর যা আমাদের নির্মাণ

বিজলি বাতিটির ভেতর তাকাও, তোমার চোখে সূর্যের ঝলক

আমি একটা বিরল আকাশ চাই

বিভ্রান্তিমুক্ত ভালো একটা জায়গা।

শিল্প শুরু হয় মিথ্যায়……।”৩

মিথ্যার এই শিল্প সত্তার কথা বলার পরেই লেখক টেনেছেন বোদলেয়ারের কথা; যিনি  প্রাকৃতিক সত্যকে মানতে পারেননি। আবার ‘সাহিত্যতত্ত্ব’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও সত্যের ওপর জোর না দিয়ে, গুরুত্ব দিলেন শিল্পকে প্রয়োজনের দায়মুক্ত এবং বস্তুর ভারমুক্ত করার উপর। লেখক শিল্পের স্বাধীনতার সত্যে পৌঁছানোর জন্য সত্যের পাশাপাশি মিথ্যের গুরুত্বকেও স্বীকার করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন সত্য নির্ধারিত, যেমন মৃত্যু। আবার মিথ্যাও স্বাধীন, যেমন অমরত্ব। তাহলে দেখা যায় সাজানো মিথ্যে নিয়েই আমাদের বেঁচে থাকা। রবীন্দ্রনাথের বিসর্জন নাটকেও জয় সিংহের মুখে এই সত্য-মিথ্যের অপূর্ব এক সংমিশ্রণ দেখতে পাই প্রবন্ধে - “সব মিথ্যা, বৃহৎ বঞ্চনা,/ তাই হাসিতেছি- তাই গাহিতেছি গান। / ওই দেখো পথ দিয়ে তাই চলিতেছে / লোক নির্ভাবনা, তাই ছোটো কথা নিয়ে / এতই কৌতুকহাসি, এত কুতূহল, / তাই এত যত্নভরে সেজেছে যুবতী। / সত্য যদি হত, তবে হত কি এমন? / সহজে আনন্দ এত বহিত কি হেথা? / তাহা হলে বেদনায় বিদীর্ণ ধরায় / বিশ্বব্যাপী ব্যাকুল ক্রন্দন থেমে গিয়ে / মূক হয়ে রহিত অনন্তকাল ধরি। / বাঁশি যদি সত্যই কাঁদিত বেদনায়, / ফেটে গিয়ে সংগীত নীরব হত তার! / মিথ্যা বলে তাই এত হাসি- শ্মশানের / কোলে বসে খেলা, বেদনার পাশে শুয়ে/ গান, হিংসা-ব্যাঘ্রিনীর খরনখতলে / চলিতেছে প্রতিদিবসের কর্মকাজ!”৪ 

এরপরেই প্রাবন্ধিক কবিতা সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন আমাদের চারপাশে যা আছে, যা আমরা দেখছি তা কবিতা নয়। যা আমাদের দৃষ্টিগোচরের বাইরে অর্থাৎ যা আমাদের সামনে নেই তাই কবিতা অর্থাৎ খোঁজ করাই হচ্ছে কবিতা। নির্দেশ নয়, অনির্দেশে যাওয়াযই কবিতার কাজ। তবে মিথ্যে হলেও এর ভেতরে লুকিয়ে থাকে নতুনত্বের সত্যের সন্ধান। তাইতো রামায়ণের কবির পুষ্পক রথ থেকে আমরা সন্ধান পাই উড়োজাহাজের। কালিদাসের মেঘবাণীর উদ্ভাস থেকে আধুনিক যুগের এসএমএসের সন্ধান। 

লেখক বারবার বলতে চান কবিতা প্রকৃতি-বিরোধী। যে রূপেই কবিতা আসুক, তাকে আত্মস্থ করা যে সে ব্যক্তির কর্ম নয়। লিখলে হয়তো পাতার পর পাতা লিখে যাওয়া যায়, যা বিরক্তি উদ্রেক ভিন্ন আর কিছুরই সৃষ্টি করবে না। কবিতা হলো নারীর মতো, কবিতা রক্তের মতো, কবিতা প্রলুব্ধতার মতো, কবিতা জিজ্ঞাসার মতো, কবিতা আমাদেরকে এমন এক সৌন্দর্য প্রতিমার কাছে পৌঁছে দেয় যার কোনো শেষ নেই। তাই বলা যায় কবিতার আরেক নাম আনন্দ। একজন মা যেমন অসহ্য প্রসববেদনার শেষে সন্তান ভূমিষ্ঠ করেন, পান স্বর্গীয় আনন্দ, একজন কবিও একখানি কবিতা লেখার পর উপলব্ধি করেন অনন্ত সাহিত্যের শেষ মূল্য; আনন্দ। সুন্দর আনন্দ দেয় তাই কবিতায় সুন্দরকে করে আবাহন। বস্তুত বলা যায়, যা আনন্দ দেয় মন তাকেই সুন্দর বলে, আর সেটাই কবিতার সামগ্রী। আর আনন্দ দেয় কেন? কারণ তা রূপ ও অরূপের, খণ্ড ও অখণ্ডের পরিপূর্ণ ঐক্য আমাদের প্রতিভাত করে বলে। কাব্য সৃষ্টির তত্ত্ব, তাই রূপের দ্বারাই অরূপকে প্রকাশ করা, অরূপের দ্বারা রূপকে আচ্ছন্ন করে দেখা। তাই কবিতা আমাদেরকে এমন এক জগতে টেনে নিয়ে যায় যেখানে থাকে সমস্ত মিথ্যার হাতছানি। সেই মিথ্যায় দাঁড়িয়ে আমরা অলীক কল্পনার জগতের স্বাদ, ঘ্রাণ নিতে পারি বাস্তবে যার কোনো অস্তিত্ব নেই। এর পাশাপাশি লেখক কবিতার আরেকটি মিথ্যার কথা তুলে ধরেছেন তা হলো কবিতার বর্ণনা। যেখানে কবি আবেগ দিয়ে একটি শব্দের পাশে অন্য একটি শব্দের সান্নিধ্য দিয়ে প্রতিফলিত ছায়া ও আলোকের খেলায় শব্দের নিজস্ব অর্থ থেকে সরিয়ে পাঠক মনকে ভোলানোর চেষ্টা করেন। 

কবি জাঁক দেরিদার মূল কথা ছিল শূন্যতা নির্মাণ অর্থাৎ স্পেস তৈরি করা। যা আছে তা ভেঙে নতুন কিছু তৈরি করা। পুরাতন যা কিছু আছে তা মানলে কিছু হয়ে উঠবে না। তিনি তো এমনও দেখিয়েছেন পুরাতন ঈশ্বরকে সরিয়েই তো জিসাসের আবির্ভাব। এই শূন্যতার কথা বলতে গিয়েই লেখক তাপস রায় কবি আলোক সরকারের নিজস্ব সত্যের কথা তুলে ধরেন যা শূন্যতার ভেতরে বাসা বেঁধেছিল। গতানুগতিক সত্যের সাথে যার কোনো যোগ ছিল না। যিনি আমাদের দেখা সত্য নয়, প্রমাণ সাপেক্ষ সত্য নয় ভিড়ের বাইরে অন্য এক নতুনত্বের কথা বলতে চেয়েছেন। এ প্রসঙ্গে তাপস রায় আলোক সরকারের ‘অপাপভূমি’ কবিতার উল্লেখ করেছেন-

“কেবল তা-ই উল্লেখযোগ্য

যা অংশগ্রহণ করেছে।

আমি তাদের কথা বলছি

যারা নিজেকে প্রমাণ করার প্রচেষ্টা নেয়নি। 


যা হতে পারত কিন্তু হয়নি

তার মতো সর্বস্বতা আর কি!

তার কোনো আক্রমণ নেই, প্রতিদ্বন্দ্বিতা নেই।”৫ 

কবিতা কীভাবে কবির ভেতর দহন তৈরি করে এবং প্রকৃতিকে বিনষ্ট করে অর্থাৎ যতক্ষণ পর্যন্ত সত্যকে ধসিয়ে রূপময় রহস্যের জন্ম না দেয় ততক্ষণ কবির ভেতর ভাঙাগড়া চলতে থাকে। যেমন পৃথিবী তৈরির মুহূর্তে সৃষ্টিকর্তার অবস্থা হয়েছিল একইরকম। এ বিষয়টিকে পাঠকের চোখে আকর্ষণীয় করে তুলতে তাপস রায় উৎপলকুমার বসুর যে উদ্ধৃতি দিয়েছেন তা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ-  “........কবিতা নিজেকে ঘিরে যে অস্তিত্ব-জটিল বাস্তবতা তৈরি করে তাকে আমরা প্রতিবিম্ব, প্রতিফলন, ছায়াপাত বলে স্বীকার করে নিলে খানিকটা স্বস্তি পাবো। কেননা আমাদের জানতে বাকি নেই যে সামান্য বাতাসে, জলবাসী প্রাণীদের সামান্য নড়া-চড়ায়, ঐ সুখী, স্থির পুকুরের ছবিটি টুকরো টুকরো হয়ে যাবে। কবিতার বাস্তবতা যেন ভেঙে পড়ার জন্যই সৃষ্টি হয়। আবার প্রতিফলনেই সে নিজেকে পুনর্গঠিত করে। আরেক বাস্তবতা সৃষ্ট হয়। তখন হয়ত সূর্য আরেকটু হেলে পড়েছে, বাতাস বাঁক নিয়েছে এবং জলজ প্রাণ আরও গভীর স্তরে অন্তর্হিত হয়েছে। অথবা, রূঢ়ভাবে বলা যায়- জল শুকিয়ে গেছে, শুকনো পাতা উড়ছে, শকটের চাকা ফেটে দু- খান হয়ে প'ড়ে আছে। আর স্মৃতিবিভ্রম তৈরি করছে কবিতা। ঐ দৃশ্যের উপর দিয়ে, গ্রীষ্মের দগ্ধ অরণ্যে লুকিয়ে-পড়া ধরা-পড়ে যাওয়া মানবমানবীর আর্ত চিৎকারের মতো, পাগল হাসির মতো, যে শব্দ-উপমা-অলংকারের ধ্বনি বাতাসে ভেসে চলেছে-তাই কবিতা।”৬ 

এরপর তাপস রায় টলস্টয়, সার্ত্র প্রভৃতি কবির  সৃজনশীলতার বৈশিষ্ট্যের কথা তুলে ধরেছেন।  এবং বোঝানোর চেষ্টা করেছেন সাহিত্য কীভাবে মিথ্যা কথা বলে। আবার একজন কবি কীভাবে তুচ্ছের ভেতর বসে থেকে ওই বস্তুপুঞ্জকে রূপান্তরিত করে তার কথাও বলেছেন। প্রসঙ্গক্রমে উৎপল কুমার বসুর শ্রেষ্ঠত্বের কথাও আলোচিত হয়েছে। আবার মাল্টে-র প্রসঙ্গ তুলে প্রাবন্ধিক দেখাতে চেয়েছেন সবার থেকে সরে এসে, এমনকি নিজের কাছ থেকেও সরে এসে মাল্টে কীভাবে একটি দুর্লভ কবিতার মুহূর্ত তৈরি করতে চেয়েছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন রক্তের অন্তর্গত সমবেত স্মৃতি যা মেঘের মতো, বৃষ্টিধারায় ঝরে পড়বে। কিন্তু তিনি এখানেও প্রশ্ন তুলেছেন এই ঝরে পড়া কি সত্য? এবং এ প্রসঙ্গে তিনি আলোক সরকারের- “যেমন অনুভূতির জগৎ সেইরকম চেতনার জগতও এক অবয়বহীন জ্যোতির্ময়তা,…... আসলে অনুভূতির জগৎ, চেতানর জগৎ একটা তালগোল পাকান আলোকপিণ্ড, তা প্রতিমুহূর্তে বহুবর্ণে বিচ্ছুরিত হচ্ছে; এক সম্পূর্ণতার প্রতিষ্ঠাবোধে যদিও তার কেন্দ্রে অবস্থিত, সেই বোধকে পরিণত সমগ্রতায় পাওয়ার জন্যই তার সকল প্রয়াস। তবু সেই বোধ কোন রূপময়তা নয়, কোন সচেতন কল্পনা-সম্ভব নয়। এই প্রবহমান ভাবময় জ্যোতির্ময়তার কোন সত্য প্রতিলিপি রচনা করবার সব প্রচেষ্টাই ভ্রান্ত প্রচেষ্টা, মানুষের সেইরকম কোন অর্থহীন পরিকল্পনা থাকবে কেন?”৭  —এই বিস্ময়ের সমর্থনকে মেনে নিয়েছেন। এবং দেখিয়েছেন সত্যের প্রতিলিপি নয় একটি কবিতায় ফুটে ওঠে একটি ফুলের হয়ে ওঠার পথের অজস্র না-এর সম্মিলিত রূপ। ‘হোয়াইট লাই’ বলে ইংরেজিতে একটি কথা আছে। সাদা মিথ্যা। অর্থাৎ যা মানুষের খুব একটা ক্ষতি করে না। বলা হয় এসব মিথ্যা আমাদের দৈনন্দিন আটপৌরে জীবনে কিছুটা লবণ-মশলার জোগান দেয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও মজা করে মংপুতে বলেছিলেন, মিথ্যা না বললে কথা বলার সুখ কোথায়? এ রকম ‘কোমল-মিথ্যা’ অহিতকর নয়। কিন্তু মিথ্যা জিনিসটাই বড়ই নিয়ন্ত্রণহীন। যার মধ্য দিয়ে একজন কবির অন্তর ও বহির্জগতের প্রতিফলন ঘটে।

স্বেচ্ছাচার, স্বাধীনচেতনা ও মদ্যপান বলতে বাঙালি কাব্য-পাঠকের কাছে যার মুখ সবার আগে ভেসে ওঠে তিনি রাতের কলকাতার স্বেচ্ছাচারী সম্রাট তথা পঞ্চাশের দশকের কিংবদন্তি কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়। কবির দাদামশাইয়ের বোহেমিয়ান দীক্ষাকে পাথেয় করেই শুরু হয়েছিল কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের পথচলা। সেই কবির কবিতা লেখার বাসনা ও অন্যান্যদের থেকে আলাদা মানুষটির কবিতার বিষয় বৈচিত্র্য ‘কবিতাগ্রস্ত শক্তি চট্টোপাধ্যায়’ প্রবন্ধের আলোচ্য। প্রাবন্ধিকের কথায় — “কবিতা তাঁর পায়ে পায়ে চলতে থাকবে ধর্মরাজের কুকুরটির মতো সারা পথ।”৮ লেখকের মতে তাঁর কবিতা কোনো এক বিশুদ্ধ মাতালের মতো। শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা আলোচনা প্রসঙ্গে উঠে এসেছে বুদ্ধদেব বসুর কথা। তিনি এই সময়ের কবিদের মধ্যে কবিতার ভাঙন দেখতে পান। যে কারণে ‘কবিতা’ পত্রিকা বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের যাত্রা এই কবিতা পত্রিকায় লেখা-লেখির মধ্য দিয়ে। গুরুদেবের মৃত্যুর পর শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের প্রতিক্রিয়ার কথাও তাপস রায় তুলে ধরেছেন। এবং প্রসঙ্গক্রমে শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের—“তোমার নিকটে এসে বৃক্ষের ভরসা পেতো কবি, ছায়া পেত সচ্ছলতা পেত।”৯ — লাইনটির গুরুত্ব ব্যাখ্যা করেছেন।

এর পরেই দেখছি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের জীবনের নৈঃশব্দ্যমুখর হওয়ার ঘটনা। যেখানে শুকিয়ে ওঠা জীবনমুখে নালিঘাসের প্রণোদনার পাশাপাশি তাঁকে ডেকে নিয়ে গেছে রাতের কড়া নাড়া। এবং নৈঃশব্দের নিশ্চলতা ও শব্দের গতিতে প্রপাতমায় করে দেওয়ার নানা সম্পর্কের খোঁজ। তাঁর কবিতা পড়তে পাঠকের কতটা নিরাসক্তি ও কবির আসক্তি কতদূর তা গদ্যকারের ভাবনায় উঁকি দিয়েছে।  

এতসব বলার পরে তাপস রায় কবির জন্মের দিকে ফিরেছেন। দেখিয়েছেন কবি কীভাবে দাদামশাইয়ের আঁতুড়ঘরে শরীরটা পাওয়ার পর আস্তে আস্তে সহজ করে নিয়েছেন আমাদের এই বাংলাভূমিকে। গ্রামের চাষাভুষোর সঙ্গে গাছপালা, পানাপুকুর ও একটা পাড়াগাঁ কবির মধ্যে চেপে বসেছে এবং তা থেকে পরিত্রাণ না পেয়েই রচনা করলেন স্মৃতিজারিত আখ্যান ‘কুয়োতলা’। এরপর বুদ্ধদেব বসুর কবিতা পত্রিকায় ‘যম’ কবিতা প্রকাশ পেল। যেখান থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে কবি দু-তিনটি টানা গদ্য লেখেন। যার মধ্যে অন্যতম ছিল ‘সুবর্ণরেখার জন্ম’ ও ‘জরাসন্ধ’। এভাবেই আবেগের বশবর্তী হয়ে হঠাৎ কবির পদ্য লেখার চ্যালেঞ্জ। কবির এই চ্যালেঞ্জের বিষয়টি নিয়েও তাপস রায় বেশ সরব। তিনি দেখিয়েছেন এখান থেকেই কবির শুরুর নির্ঝর কতদূর বেগবান হয়ে উঠবে। কবির ‘হৃদয়পুরে চলিতেছিল জটিলতার খেলা’ রচনার মধ্য দিয়ে যেন বাংলা কবিতার জগৎ শব্দজাদুর সম্মোহন ও নিজস্ব লিরিকের তোড়ে ভেসে যায়। যা থেকে উত্তরণের ফল কবির প্রথম প্রকাশিত কবিতার বই ‘হে প্রেম হে নৈঃশব্দ্য’ (১৩৬৭)  এই বইয়ের কবিতাগুলি সম্পর্কে তাপস রায় বলেছেন – “এই বইয়ের প্রতিটি কবিতাই মন্ত্রমুগ্ধকর এক অনন্ত গভীরতার দিকে টেনে নিয়ে যেতে থাকে। পাঠকের সামনে এমন সব রূপ-রহস্যের সঘন আহ্বান যেন স্তম্ভিত হতে হবে, যেন বাঘের সৌন্দর্যের মরীচিকার সামনে রূপমুগ্ধ হরিণ। জীবনের ভেতর এক না-এর সৌন্দর্য, না-এর দুঃখ-কে কবি প্রাকরণিক ভাবে কবিতার সঙ্গে মিলিয়ে দেবেন আজীবন। যন্ত্রণা আশ্লিষ্ট এই উচ্চারণ পড়তে পড়তে পাাঠকেরও মনে হতে পারে ভাষা যেন কবির আবেগের গলন্ত লাভাকে ধরে রাখতে অক্ষম। কিছুই যেন বলা হল না, অথচ আত্মজীবনীতে জ্বলে যাচ্ছে চারপাশ। ওই বলার অভিনবত্বের ধাক্কায়, প্রচলিতকে তাচ্ছিল্য করার প্রত্যক্ষতায় শব্দ-ছন্দ-ভাষা ও বিষয় এক নিখিল প্রপঞ্চের মতো বয়ে গেছে, যাকে রোখা যায় না। এ যেন এক ঘোরের নিশিথ।”১০ 

গদ্যকার কবি শঙ্খ ঘোষের ‘জার্নালের’ দৃষ্টিভঙ্গির মধ্য দিয়ে শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের ‘হে প্রেম হে নৈঃশব্দ্য’ সম্পর্কে আলোচনা করেছেন । পাশাপাশি সমসাময়িক এবং পূর্ববর্তী বিভিন্ন কবিদের পদচারণার বিষয়টিও স্পষ্ট করেছেন লেখক। ওই সময়ের কবিদের ‘নীতিহীন উৎকট’-এর অপবাদের জন্য বুদ্ধদেব ‘কবিতা’ পত্রিকার প্রকাশ বন্ধ করে দিলেন। কিন্তু শক্তি চট্টোপাধ্যায় পাপবোধ ও প্রকাশে আত্মপ্রতারণা করতে চাননি তার স্পষ্ট প্রমাণ মেলে তাপস রায়ের উদ্ধৃত লাইনটিতে — “একটি ঘুরে, একটি দূরে, একটি চোখের সোজা / গোপন যিনি ছিলেন, তাঁকে বয়সকালে বোঝায়।”১১ 

পরবর্তী পর্বে দেখা যায় স্বতঃরচনার ঝোঁকে কবির সমস্ত সৃষ্টিশীলতা কীভাবে বয়ে গেছে। সেখানে রয়েছে প্রকৃতি, মৃত্যু, আসঙ্গ ও নিঃসঙ্গতা। বোদলেয়ারের বিভাব ও হাংরি আন্দোলনের আলো-ছায়ায় তাঁর বৃত্ত তৈরি হয়েছে। যেখানে কবির পরিচয় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, আচ্ছন্নে, অবচেতনে, উদাসীনতায়। তিনি নিজেকে অনন্তের হাতের সমর্পণ করতে করতে পাঠককেও টেনে নিয়ে গেলেন ফাঁসুড়ে উপত্যকায়, যেখানে মৃত্যু মানে অবলুপ্ত চেতনার অনাহত পরাক্রম। আর এই চলার শেষ নেই যে কারণে রোমান্টিকতা দিয়ে ছেয়ে ফেলার আগ্রহে সেজে উঠছে- ‘হে প্রেম, হে নৈঃশব্দ্য’, ‘ধর্মে আছো জিরাফেও আছো’, ‘সোনার মাছি খুন করেছি’, ‘হেমন্তের অরণ্যে আমি পোস্টম্যান’, ‘প্রভু নষ্ট হয়ে যাই’, ‘ঈশ্বর থাকেন জলে’, ‘সুন্দর এখানে একা নয়’ প্রভৃতি কাব্যগ্রন্থ। প্রবন্ধে আমরা স্পষ্ট বুঝতে পারছি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা না পড়েও কাব্যগ্রন্থের নামগুলো থেকেই বোঝা যায় এগুলো মানুষকে আচ্ছন্ন করার জন্য যথেষ্ট। পাঠকের হৃদয়ে, রক্তে, মজ্জায় সম্মোহন ছড়িয়ে দিতে এগুলোই যথেষ্ট। 

আরও একটি বিষয় তাঁর মননে আলোচিত— শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের মধ্যে বিষণ্নতার একটা ঘোর ছিল যা তাঁকে চালিত করেছে,  জারিত করেছে; যেখানে তিনি মুক্তির আলোর আস্বাদ পেয়েছেন। যে আলোয় সিদ্ধার্থ গৃহত্যাগী হয়ে বুদ্ধদেব হন, যিশুখ্রিস্ট যন্ত্রণাদীর্ণ হতে হতে আলোক উৎসারণ করেন, সেখানেই রোমহর্ষের মতো ওই অনন্ত নক্ষত্রবীথির নিচে তিনি কবি পোস্টম্যান। বিষণ্নতার চিঠি আর খোলা হৃদয় নিয়ে শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কারবার ছিল। নিজের জীবনের ব্যথা বেদনাকে অন্যের ভেতর চারিত করতে করতে গোটা জীবনটা কাটিয়ে দিয়েছেন। ফলে বোঝা যায় কবির প্রথম কবিতা ‘যম’ এবং শেষ কাব্যগ্রন্থ ‘জঙ্গল বিষাদে আছে’ (১৯৯৪) শিরোনামে আনন্দ পাবলিশার্স থেকে প্রকাশিত হয়। ফলে তাপস রায় বোঝাতে চাইছেন যে কবির জীবনের শুরু এবং শেষ একই বিষাদময়তায় চিহ্নিত হয়ে আছে ।

এরপরে লেখক তাপস রায় দেখিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ এবং শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের মৃত্যু চেতনাকে। রবীন্দ্রনাথ সারা জীবনেই মৃত্যুকে সঙ্গে নিয়ে চলেছেন। ফলে তাঁর কাছে মৃত্যু ভাবনা এসেছে বিচিত্ররূপে। কখনো শ্যামের সাথে মিলনের আনন্দে, কখনো স্বপ্নশেষে মহান বৃহতে মিলিয়ে যাবার অসীম হুতাশনে। লেখক আমাদের তরুণ পঞ্চাশের কবি মৃত্যু সম্পর্কে তাঁরই কথায় বলেন — “মৃত্যুর পরেও যেন হেঁটে যেতে পারি।”১২ অর্থাৎ তিনি যেন জীবনের আনন্দের বিচ্ছেদের চেতনায় নিজেকে জড়িয়ে ফেলেছেন। তাই তো বিচ্ছেদকে প্রাণে ধারণ করে লিখলেন – “সব দিকেই যাওয়া চলে / অন্তত যেদিকে গাঁ-গেরাম-গেরস্থালি / পানাপুকুর, শ্যাওলা-দাম, হরিণমারির চর-/ সব দিকেই যাওয়া চলে/ শুধু যেতে-যেতে পিছন ফিরে তাকানো যাবে না।”১৩ ফলে বোঝাই যাচ্ছে সমস্ত জীবনটাই শক্তি চট্টোপাধ্যায় মৃত্যুর মহাসঙ্গীত পরিবেশন করেছেন। হয়তো তিনি বিচ্ছেদকে সামনে রেখে ভালোবাসাকে গোপনে লালন করতে চেয়েছিলেন সেজন্যই জীবনের হাহাকার  নয় বরং প্রগাঢ় মৃত্যুর কথা তিনি লিখেছেন। 

গদ্যকার দেখিয়েছেন সবার মধ্যে থেকেও কবির বাসনা ছিল একলা হবার। যে কারণে তিনি একইসঙ্গে আন্দোলন, মদ খাওয়া ও পত্রিকা প্রকাশ- সবেতেই অনায়াস নিমগ্ন ছিলেন, কবিতা লিখেছেন নিজের মতো করে, জীবনের নিংড়ানো ফোঁটা ফোঁটা স্বর থেকে তিনি লিখেছেন ৬০টি পদ্যের বই। ফলে ভাষার ব্যবহারেও সঠিক ক্রম রক্ষা করতে পারেননি। এক্ষেত্রে তাপস রায় সমীর সেনগুপ্তের কথা সমর্থন করেছেন-“...অশালীন শব্দ, কুরুচিকর শব্দ, গ্রাম্য শব্দ এমনকি যেসব শব্দের শিষ্ট প্রয়োগই নেই, খিস্তি ছাড়া ব্যবহারই নেই, তেমন শব্দকেও শক্তি সম্মানের আসন দিয়েছেন তাঁর কবিতায়, ঘুচিয়ে দিয়েছেন শব্দসম্পর্কে সকলপ্রকার শুচিবায়ু। এবং এই শব্দগুলোকে তিনি শালীন ও প্রথাসিদ্ধভাবে নান্দনিক শব্দাবলীর সঙ্গে এমন কুশলভাবে মিশিয়ে দিয়েছেন যে শব্দগুলো কোথাও খোঁচা তোলে নি, কবিতার মূল সুর থেকে আলগা হয়ে আসে নি। তাঁর জীবনের দিকে তাকালেও মনে হবে এ তেমন বানিয়ে তোলা নয়।”১৪ (পোকায় কাটা কাগজপত্র, পারে কাঁথা মাটির বাড়ি, শ্রেষ্ঠ কবিতা)। 

এভাবেই প্রাবন্ধিকের কলমে সিদ্ধ হয়, শক্তি চট্টোপাধ্যায় আমৃত্যু প্রকৃতির কবি, সময় কিংবা সময় সংক্রান্তির চেতনা তাঁর কবিতায় অনুপস্থিত। শুধু প্রকৃতি তাঁকে আকর্ষণ করেছে এবং কখনও কখনও পরাবাস্তববাদী কবির মতোই সেই প্রকৃতিকে তিনি দেখেছেন, ‘জঙ্গলে সবার জন্যে অকৃপণ নিয়ন্ত্রণ আছে’। এমন পঙ্ক্তি তাঁর কবিতাতেই পাওয়া যায়। শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতায় আছে মানসচিত্র।

রবীন্দ্রনাথের ‘ছিন্নপত্র’-র ঐতিহ্যে বাংলার দুজন মহৎ শিল্পীর জন্ম হয়েছে। একজন ‘পথের পাঁচালী’র বিভূতিভূষণ, আরেকজন ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি-মহাপৃথিবী’র জীবনানন্দ। জীবনানন্দ যখন একাজটি নিপুণ হাতে শুরু করেছেন সেই সময়টা ছিল আধুনিক বাংলা কবিতার সময়। আধুনিক কবিতা যে পঞ্চপাণ্ডবের হাতে পরিপূর্ণতা লাভ করেছিল তাঁরা হলেন-বুদ্ধদেব বসু, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, অমিয় চক্রবর্তী, জীবনানন্দ দাশ ও বিষ্ণু দে। রবীন্দ্র পরবর্তী আধুনিক কবিতা এই পঞ্চপাণ্ডবের হাতে শৈশব থেকে কৈশোর উত্তীর্ণ হয়ে যৌবনের পরিপূর্ণতা অর্জন করেছিল। এই পঞ্চপাণ্ডবের মধ্যে জীবনানন্দ দাশ ছিলেন অন্যতম। জীবনানন্দ দাশের কাব্যের বিষয়বস্তু, আঙ্গিক, শব্দকুশলতা ছিল অন্যদের থেকে ভিন্ন। এই ভিন্নতার বিভিন্ন দিক নিয়ে তাপস রায় ‘জীবনানন্দ : নতুন বাংলাভাষা’ প্রবন্ধে আলোচনা করলেও মূল ভাব রেখেছেন তাঁর কবিতার ভাষা বয়নের প্রসঙ্গ। প্রবন্ধের প্রথমেই তিনি বলেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জীবনানন্দের কবিতার প্রশংসা করলেও তাঁর কাব্যভাষা নিয়ে আপত্তি করে বলেছেন- “ভাষা নিয়ে এত জবরদস্তি কর কেন বুঝতে পারিনে।  কাব্যের মুদ্রা দোষটা ওস্তাদিকে পরিহসিত করে।”১৫ কিন্তু জীবনানন্দের এসবের দিকে মন ছিল বোঝাতেই প্রাবন্ধিক জীবনানন্দের ‘কবিতার কথা’ প্রবন্ধের উক্তিতে টেনেছেন “ভিড়ের হৃদয় পরিবর্তিত হওয়া দরকার।”১৬  সেই তাগিদেই তিনি এক ভিন্ন আঙ্গিকে-ভিন্ন শব্দকল্পের ব্যবহার এর মধ্য দিয়ে - ভিন্ন বাক্যের কূটচালে গড়লেন নিজের কবিভাষা। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের দাবদাহে রবীন্দ্রনাথ যেখানে বলেছিলেন ‘মানুষে বিশ্বাস হারানো পাপ’ সেখানেই কষ্টকল্পনা থেকে বাধ্য হয়ে জীবনানন্দকে বলতে হয় ‘পেঁচার ধূসর ডানা সারারাত জোনাকির সাথে কথা কয়।’ অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথ তাঁর জীবনচর্চার মতো ভাষায় সরল অন্বয় গঠনের পক্ষে মত দিলেও, নতুন কবি প্রতিভা জীবনানন্দ তা মেনে নিতে পারেননি। আর মৃত্যুর কিছুদিন পরে অমিয় চক্রবর্তী বুদ্ধদেব বসুকে বোস্টন থেকে লিখেছিলেন- “ওঁর(জীবনানন্দ) কবিতায় একটা ভারি আশ্চর্য রহস্যময় সুর ছিল, মনে হ’তো জীবনের বিচ্ছিন্ন বহু ঘটনার মূলে পৌঁছিয়ে তিনি সমস্তটাকে বলবার ভাষা তৈরি করেছেন। পড়তে পড়তে সেই একটি আকাশী, সর্বাধিক সঞ্চারী গাঢ় রঙে ভরা ভাষা আমরা তার কবিতায় শুনতে পেয়েছি।”১৭ তাপস রায় এই যুক্তি দিয়ে দেখাতে চেয়েছেন এই সঞ্চারি দ্যোতক ভাষা জীবনানন্দ সচেতনভাবেই গ্রহণ করেছেন। 

জীবনানন্দের ভাষা ও কাব্যিক গঠন তাঁকে বাংলা কবিতার ইতিহাসে এক বিপ্লবী চরিত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তিনি ছন্দবদ্ধ পদ্যের পরিবর্তে মুক্তছন্দের প্রয়োগ করেছেন, যেখানে দীর্ঘ পঙ্ক্তি ও অপ্রত্যাশিত অলংকার এক অদ্ভুত সংগীতধর্মিতা সৃষ্টি করে। পৃথিবীর নতুন প্রকাশ ও তার বহুমাত্রিকতায় জীবনানন্দ দাশ চেয়েছিলেন এক নতুন বাস্তবেকে আনতে  যেখানে কবিতায় অন্তর্গামী আলোক উষ্ণতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। যে আলোতে বস্তুর অন্দরমহল দেখা যাবে এবং সীমাহীনের এক নতুন স্পন্দন যুক্ত হবে। যে বোধ থেকে নতুন মহিমার ফলে এক কবিভাষার জন্ম হয় যার রূপ তাপস রায় দেখিয়েছেন: 

“অচেনা ঘাসের বুকে আমারে ঘুমায়ে যেতে বলে,

তবুও সে-ঘাস এই বাংলার অবিরল ঘাসের মতন

মউরির মৃদু গন্ধে ভ'রে রবে;-কিশোরীর স্তন

প্রথম জননী হয়ে যেমন ননীর ঢেউয়ে গলে

পৃথিবীর সব দেশে- সব চেয়ে ঢের দূর নক্ষত্রের তলে

সব পথে এইসব শান্তি আছে; ঘাস-চোখ-শাদা হাত-স্তন।”১৮ 

যার নতুন প্রকাশ রূপ বাংলা কবিতায় এর আগে ছিল না। তিনি একই শব্দ বারবার ব্যবহার করে পাঠককে কোনো এক অনুভাবের কাছে নিয়ে যেতে চেয়েছেন। গদ্যকারের ভাষায়- “জীবনানন্দ খুব কাছ থেকে দেখেছেন নিজের সঙ্গে পৃথিবীর অন্যান্য বিষয়ের ঘাত প্রতিঘাত। আর তার প্রতিক্রিয়ায় তিনি এক চিরন্তনতায় নিয়ে যেতে চেয়েছেন পাঠককে। সময়, সমাজ ও ইতিহাসের পুনর্নির্মাণের জন্য। মানুষের নতুন আশ্রয়স্থলের জন্য তিনি চেয়েছিলেন বস্তুর অতিরেকে মহত্তর বাস্তব। অস্তিত্বের সর্বাত্মক সংকটে আপন্ন কবি জীবনানন্দ বারবার আত্মমুখিন হয়ে ভাষাকে আক্রমণ করেছেন। মানুষের যান্ত্রিক হৃদয়হীনতায় আক্রান্ত তিনি ভাষার যান্ত্রিকতা ভেঙে দিতে চেয়েছেন। অবচেতনার ভাষা, অস্ফুটের স্পন্দন, অস্তিত্বের কেন্দ্রে অবতরণের জন্য যুক্তি-শৃঙ্খলার বাইরে যেয়ে চিত্রকল্পের অবিচ্ছিন্ন প্রবাহ, মুহূর্তের ছবির মধ্যে চিরকালীন অনুভূতি ধরে ফেলা তাঁর অভীপ্সা। বাংলার নিসর্গকে নিজস্ব রেখেও স্বপ্নময় জগৎ ও বাস্তব জগতে যাতায়াত-যেখানে কবিতায় অন্তর্গামী আলোক উষ্ণতাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। যে আলোতে বস্তুর অন্দর মহল দেখা যায়, নতুন সম্পর্ক তৈরি হয়, সীমাহীনের স্পন্দন যুক্ত হয়।”১৯

নতুন যুগের বিজ্ঞানচেতনা জীবনানন্দের কবিভাষাকে নির্মাণ করেছে বলে প্রাবন্ধিকের ভাবনা।  যেখানে তিনি বস্তুবিশ্বের পরিচয় খুঁজতে গিয়ে অতিশায়ী অন্য জগতের আশ্রয় নিয়েছেন। স্বপ্নবিশ্বাস-এর পরিমিত প্রসারক অভীপ্সাকে দিয়ে তিনি যে ভাষা নির্মাণ করেছেন তা হচ্ছে— জাদুভাষা, যার বর্ণনা প্রসঙ্গে লেখক বলেন- 

“নির্জন জলের রং তাকায়ে রয়েছে;

তোমার বুকের প'রে আমাদের পৃথিবীর অমোঘ সকাল

হাজার বছর শুধু খেলা করে অন্ধকারে জোনাকির মতো।”২০

প্রচলিত অভিজ্ঞতার বাইরে মহাচেতনায় গিয়ে তিনি পরাজয়ক্লিষ্ট মুক্তিকামী আধুনিক মানুষের মুক্তি খুঁজেছিলেন। যা বাংলা কবিতায় এক নতুন ঘোর। 

প্রবন্ধে আমরা দেখি জীবনানন্দের কবিতার ভাষায় একটি বিশেষ সুরের আয়োজন  আবর্তন আছে। একই সঙ্গে তা মূর্ত ও বিমূর্ত এই প্রসঙ্গে সাহিত্যস্রষ্টা উদ্ধৃতি করে শঙ্খ ঘোষের ভাষায় বলেন— “পৃথিবীর সমস্ত জল ছেড়ে দিয়েও নতুন এক জলের কল্পনা করতে চেয়েছিলেন কবি, সমস্ত দীপ ছেড়ে দিয়ে দেখেছিলেন এক নতুন দীপ। এইভাবে তিনি দেখেন জল নয়, তার জলত্ব। দীপ নয়, তার দীপতা। অর্থাৎ বস্তু নয়, এক বস্তু সংগতি।”২১ - আসলে এই সংগতিবোধ এবং এই অনুভাবের উন্মোচনই হচ্ছে জীবনানন্দের ভাষার মূল বীজ। 

জীবনানন্দ দাশের কাব্যজগৎ শুধু পদ্যরচনার ক্ষেত্রে নয়, বরং বাংলা ভাষার সম্ভাবনা বিস্তারেও অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। তাঁর ব্যবহৃত শব্দচয়ন—যেমন ‘নীলিমা’, ‘স্মৃতিছায়া’, ‘অন্ধকারের রেশ’—আজ বাংলা সাহিত্যের স্থায়ী শব্দভাণ্ডারে পরিণত হয়েছে। মননশীল স্রষ্টার ব্যাখ্যায় বুদ্ধদেব বসুও জীবনানন্দের অভাবনীয় জাদু কল্পনা দেখে অনুরক্ত হয়েছিলেন। এ ছাড়াও তাঁর অনুরাগের মূল কারণ ছিল জীবনানন্দের কবিতার ধ্বনিবৈশিষ্ট্য এবং শব্দের মূল্যবোধের জন্য। প্রাবন্ধিক তাপস রায় বুদ্ধদেবের অনুরক্তির কারণ হিসাবে যে তিনটি বিষয় তুলে ধরেছেন তা হলো- 

“১। নিজের ব্যবহারের জন্য তৈরি করে নেওয়া তাঁর নিজস্ব আলাদা ভাষা-সংস্কৃতি বিবর্জিত দেশজ শব্দপ্রযুক্ত সে ভাষা পিওরেস্ট বাংলা ভাষা।

২। মধুর অবসাদের ক্লান্তি জড়ানো অলসগামিনী অসমছন্দ যা ‘বলাকা’-র থেকে অন্য রকম। আর

৩। তাঁর অদ্ভুত ডিকশন, যে ডিকশন সম্পূর্ণ তাঁর নিজের বস্তু।”২২ জীবনানন্দের প্রতি বিহ্বলতা ও শ্রদ্ধা প্রমাণ স্বরূপ বুদ্ধদেব বসু ‘দময়ন্তি’ তাঁকে উৎসর্গ করেছিলেন। 

তাপস রায়ের মতে জীবনানন্দের শিল্পকর্মের যেসব দিক জীবনানন্দকে তার পূর্ববর্তী বা সমসাময়িক সকল বাঙালি কবিদের থেকে এতটা আলাদা করে তুলেছিল, তার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হল তার অবিশ্বাস্যভাবে সংবেদনশীল কাব্যিক রচনা ও তুখোড় কাব্যিক ভাষা। তবে অনেকে ‘অবিশ্বাস’ ও ‘অনিশ্চয়তা’কে প্রতিবন্ধকতা মনে করেছেন। কিন্তু জীবনানন্দ তা ভাবেননি। জীবনানন্দ দাশ কবিতা ও গদ্যচর্চা করেছেন কবিতাকে ভালোবেসেই। তিনিই উত্তর প্রজন্মের কবি ও পাঠককে কবি ও কবিতার দায়কে চিনতে শিখিয়েছেন। এজন্যই জীবনানন্দ দাশ হয়ে উঠেছেন বড়ো কবি। কবির জীবনের সবকিছুই কবিতার পঙ্ক্তিমালা দিয়ে সাজানো। কবিতার মতো জীবনানন্দ দাশের কবিতাবিষয়ক গদ্যেও শিল্পবিভার স্ফূর্তি সংগত কারণেই অস্বীকার করা যায় না। রবীন্দ্রনাথ পরবর্তী সময়ে জীবনানন্দ দাশ কবিতায় নিজস্ব ভাষা নির্মাণ করেছিলেন। পঞ্চপাণ্ডবদের মধ্যে তিনি অগ্রগণ্য ছিলেন। শুধু কবিতাতেই না তিনি কথাসাহিত্য ও গদ্যতেও নতুন পথের সন্ধান করেছিলেন; এই তথ্যকে আরও মজবুত করতে নিবন্ধকার বুদ্ধদেব বসুর কথায় লেখেন— “জীবনানন্দকে বাদ দিয়ে ১৯৩০ পরবর্তী বাংলা কাব্যের কোনো সম্পূর্ণ আলোচনাই হতে পারে না।”২৩

‘রবীন্দ্রনাথ ও গীতাঞ্জলি’ প্রবন্ধে তাপস রায় রবীন্দ্রনাথের গীতাঞ্জলির সৃষ্টির প্রেরণা ও হয়ে ওঠার প্রেক্ষাপটের পাশাপাশি বঙ্গলক্ষ্মীর ঘরে নোবেল পুরস্কারের প্রেক্ষাপট বর্ণনা করেছেন। শুরুতেই প্রাবন্ধিক বলেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর লেখা ১৫০ বছর পরেও প্রাসঙ্গিক থাকবে কিনা, সে বিষয়ে সন্দিহান ছিলেন। তাই তো তিনি বলেছিলেন ‘আজি হতে শতবর্ষ পরে কে তুমি পড়িছ বসে’। কিন্তু তাঁর দূরদর্শিতা এবং বাংলা ভাষার প্রতি ভালোবাসার কারণে আজও তিনি বাঙালির কাছে প্রিয় আশ্রয় হয়ে আছেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন বাঙালির প্রাণে দোল দিতে গেলে তার পরিপূরক দরকার লিরিকের তোড়া অর্থাৎ গান। আর সেই ভাবনাকে বাস্তবায়নের জন্যই তিনি ‘গীতাঞ্জলি’-র ৮৫টি কবিতাতে সুর দেন। প্রাবন্ধিক এ প্রসঙ্গে আরও বলেন- “রবীন্দ্রনাথ যে অরূপের সন্ধান করেছিলেন, যে মুক্তি চেখে দেখতে চেয়েছিলেন, তার শ্রেষ্ঠ প্রকাশ হয়তো বা এই গীতাঞ্জলি। যেখানে একটি সৃজনের ভেতর বাহির মিলেমিশে মহাসঙ্গম। কবিতার নিটোল শিশির মুক্তো ঝলক গানের সুতোয় বেঁধে ঝুলিয়ে দিলেন বঙ্গলক্ষ্মীর গলায়। খাদহীন ভারত আত্মার পূর্ণ প্রকাশ যেন এইখানে।”২৪ এই ভাবে নিজের ভাবনাতেই কবিতা সুরের হাত ধরে বেরিয়ে গেছে আমাদের ধরাছোঁয়ার চার দেওয়ালের বাইরে। 

‘গীতাঞ্জলি’র ভূমিকা থেকেই বোঝা যায় তিনি কোনো এক ভাগবত ঐক্যের সন্ধান পেয়েছিলেন যা প্রেম, পূজা, প্রকৃতি ও স্বদেশকে একসাথে গ্রথিত করেছিল। সেই ঐক্যের খোঁজেই তাঁর লেখায় জীবনদেবতার কথা বার বার প্রকাশ পেয়েছে। কিন্তু কে সেই জীবনদেবতা? প্রাবন্ধিক তাকে বিভিন্ন ভাবে ধরে নিতে চেয়েছেন। কখনো ভেবেছেন সেই জীবনদেবতাই হচ্ছে কবির সৃষ্টির প্রেরণা আবার অন্যত্র ভাবতে চাইছেন মানুষের অমল সুষমার কাছাকাছি একটি উদার প্রকৃতি। যেখানে প্রেম-বিরহের প্রেরণার উৎস নিহিত। সেখানে চলে প্রাণের আনন্দের খেলা, থাকে না কোনো জটিলতা। তাইতো বিশ্বকবির কথায় গদ্যকার বলতে চান — “তুমি ভোরের বেলা ডাক দিয়েছ কত / যেন আমার আপন সখার মতো, / হেসে তোমার সাথে ফিরেছিলাম ছুটে / সেদিন কত না বন বনান্ত/”২৫ (গীতাঞ্জলি, ৬৮ সংখ্যা) এখানে প্রাবন্ধিকের কথায় বুঝতে বাকি থাকে না যে, বালক তার সারল্য নিয়ে ছুটোছুটি করছে সে আর কেউ না কবির জীবনদেবতা তাঁর সাথি। এই বালক মনকেই কবি সচল রাখতে যেমন চেয়েছিলেন তেমনি সবসময় চেয়েছিলেন জীবনদেবতাকে পাশে রাখতে। তাই তো ৫০ বছরের চাপ পড়ার পরও তিনি ‘গীতাঞ্জলি’ লিখতে পেরেছেন। প্রাবন্ধিকের ভাষায়- “এই অহংহীন মুক্ত একটি মনের অনাড়ম্বর প্রকাশকে বক্ষমান করেই যেন রচিত হয়েছিল গীতাঞ্জলির প্রথম কবিতাটি।”২৬ 

আবু সয়ীদ আইয়ুবের ভাবনার গভীরে প্রবেশ করে তাপস রায় দেখাতে চেয়েছেন তাঁরা ‘গীতাঞ্জলি’র কবিতাগুলিকে যে বিশুদ্ধ আখ্যা দিয়েছেন তাতে আছে মুগ্ধতা, কিন্তু দোলাচলতার কোনো নিরসন ঘটে না। শুধু তাই না, যে সমস্ত তাত্ত্বিকেরা গীতাঞ্জলি নিয়ে কাটাছেঁড়া করেছেন তাঁরা মহত্ত্বের চেতনার উদ্বোধন ছাড়া তেমন কোনো ধর্মীয় বিশেষ দিক খুঁজে পাননি। এমনও হতে পারে যে কবি নিজেই ধরা দিতে চাননি; এই ভাবনাকে সামনে আনতে মননশীল স্রষ্টা বলেন — “আমার একলা ঘরের আড়াল ভেঙে/ বিশাল ভবে/ প্রাণের রথে বাহির হতে/ পারব কবে।”২৭ (৮৪ সংখ্যা) এ ছাড়াও, নিবন্ধকারের দৃষ্টিতে পাশ্চাত্যের কবি-প্রসঙ্গও চমৎকারভাবে উঠে এসেছে। কবি কিটসের সৌন্দর্যবোধের মতোই ‘গীতাঞ্জলি’ পর্বেও রবীন্দ্রনাথের সৌন্দর্যচেতনার এক অপূর্ব বিস্তার লক্ষ করা যায়। এই ভাবনারই প্রতিফলন ঘটাতে গিয়ে আলোচক বিশ্বকবির নিম্নলিখিত পঙ্‌ক্তিগুলো উদ্ধৃত করেছেন— “সুন্দর, তুমি এসেছিলে আজ প্রাতে/ অরুণ-বরণ পারিজাত লয়ে হাতে।/ নিদ্রিত পুরী, পথিক ছিল না পথে,/ একা চলি গেলে তোমার সোনার রথে, / বারেক থামিয়া মোর বাতায়নপানে/ চেয়েছিলে তব করুণ নয়নপাতে।/ সুন্দর, তুমি এসেছিলে আজ প্রাতে।”২৮ (৬৭ সংখ্যক কবিতা) 

এরপর প্রবন্ধে দেখি কীভাবে গীতাঞ্জলির সামীপ্যে ভারতীয় মিস্টিসিজম সংশয়বাদী ইউরোপীয় মননকে ভাসিয়ে দেয়। যে ভাবে শ্রীচৈতন্য মধ্যযুগের স্থিরাবস্থাকে সচল করেছিলেন সেই একই ভাবে সবই সচল হয়ে যায়। শুধু ইয়েটস বা রদেনস্টাইন নন, ইংল্যান্ডের আর এক কবি টমাস স্টার্জ রদেনস্টাইনের বাড়িতে ‘গীতাঞ্জলি’ শুনে মুগ্ধ হয়ে সুইস অ্যাকাডেমির নোবেল কমিটির সচিবকে চিঠি দেন। আর তারপরই টমাস হার্ডিকে সরিয়ে পুরস্কার প্রাপক হিসেবে রবীন্দ্রনাথের নাম নথিবদ্ধ হয়। গীতাঞ্জলির আধ্যাত্মিকতা, আশা ও সৌন্দর্যের রস পান করে মুগ্ধ এজরা পাউন্ড, আর্নেস্ট রীস, মে সিনক্লেয়ার, টমাস স্টার্জ মূর—এঁর মতো বিদেশি ও আমাদের দেশের শ্রোতারা। এরপর রবীন্দ্রনাথের নিউইয়র্কের বক্তৃতা দিতে যাওয়া আর ইন্ডিয়ান সোসাইটি অব লন্ডন রদেনস্টাইনের প্রচ্ছদে, ইয়েটসের ভূমিকায় ১০৩ টি অনূদিত কবিতা নিয়ে প্রকাশিত হয় ‘গীতাঞ্জলি’ বা ‘Songs Offerings’। পাশাপাশি ১৯১৩ সালে বঙ্গলক্ষ্মীর ঘরে উঠে আসে নোবেল পুরস্কার।  

বুদ্ধদেব বসু সর্বতোভাবে কবি। আবার একইসঙ্গে সাহিত্যক্ষেত্রে এমন কোনো দূরতম প্রান্ত আছে কি, যেখানে তিনি নিজের ফসল ফলাননি? রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে একটি আলোচনায় এইরকমই বিস্ময় প্রকাশ করেছিলেন বুদ্ধদেব। বলেছিলেন, সাহিত্যের সর্বক্ষেত্রেই তাঁর ভূমিকা এমনই সর্বাতিশায়ী- সাহিত্যে র যে কোনো বিচরণভূমিতেই তিনি স্বরাট।

  কিন্তু আজ যদি প্রশ্ন ওঠে, রবীন্দ্রনাথের পর এত বহুমুখী শিল্পকলায় সার্থকতা অর্জন করেছেন কে? যদি প্রশ্ন ওঠে, সৃষ্টির বহুলতায় সমকালীন সাহিত্যিকদের অনায়াসে ছাপিয়ে গেছেন কে? এইসব প্রশ্নের উত্তর যে সাহিত্যিকের দিকে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে- তিনি বুদ্ধদেব বসু। অবশ্যই এই দ্বিতীয় প্রশ্নটির উত্তরও ততখানি সম্মানজনক হত না, যদি না আমরা জানতাম যে, তাঁর প্রতিটি সৃষ্টিই আমাদের কতখানি বিস্ময় উৎপাদন করে, প্রফুল্লতা এনে দেয়, আমাদের তাঁর সাহিত্যের প্রতি আরও আগ্রহী করে তোলে। বুদ্ধদেব বসু শুদ্ধতায় কবিতাকে আশ্রয় করেছিলেন। তিনি শুধু কবিতার জন্য নয়, কবিদের বৃদ্ধি ও কবিতার বিস্তারের চেষ্টা করেছেন আজীবন। তাই তো তাপস রায় বলেছেন, — “বুদ্ধদেব কবিতার চিরায়ত জগৎ দিয়ে এই পৃথিবীর মরণশীলতা থেকে মুক্তি দেখতে চেয়েছেন। এই মুক্তি তো শুধু নিজের জন্য নয়, এজন্যই নতুন নতুন কবিকুল তৈরীর প্রচেষ্টা, কবিতা সচেতনতার জন্য নিরন্তর ধর্মপ্রচারকের আগ্রহে কবিতার সৌন্দর্য প্রতিমা নির্মাণে প্রয়াসী। ব্লেকের সৌন্দর্য তত্ত্ব যেভাবে spiritualism এর কাছাকাছি চলে যায়, লরেন্স যেভাবে দেখেন। বুদ্ধদেবও। আর কবিতা থেকে কাব্যিকতার মুক্তি দিয়ে তিনি হয়ে উঠলেন প্রথম যথার্থ আধুনিক। বুদ্ধদেব বসুর সৌন্দর্য চেতনায় ছিল ডিটেলস্। খুঁটিয়ে লক্ষ্য করার ঝোঁক ছিল তাঁর। পায়ে হেঁটে পথ দেখা যেন।”২৯ এছাড়াও তাপস রায় বিভিন্ন সমালোচকের মন্তব্য বিস্তারিত ব্যাখ্যা করে বোঝাতে চেয়েছেন কবিমানসের পরিসরকে। 

বুদ্ধদেব বসুর কবিদের সংগ্রাম নিজের কাঁধে তুলে নেওয়াকে কবিতার শিক্ষকতা বলে ব্যক্ত করেছেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। তাঁর ‘উনিশে বিধবা মেয়ে’ কবিতাটি বুদ্ধদেব বসু বেশ কয়েকবার পরিবর্তন করেছেন। পাশাপাশি সুধীন্দ্রনাথ, বিষ্ণু দে, অমিয় চক্রবর্তী, সমর সেন, সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের মতো দিকপাল কবিদের নিয়ে তিনি দীর্ঘ সব প্রবন্ধ লিখেছেন। তাতে কিছুটা হলেও নিজের সৃষ্টিশীলতাকে বিসর্জন দিতে হয়েছে বুদ্ধদেব বসুর। তিনি ২৫ বছর পূর্ণ হওয়ার পর ‘কবিতা’ পত্রিকা বন্ধ করে দেন। তারপরই আক্ষেপ প্রকাশ করেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। অন্য লেখকের লেখার প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ বুদ্ধদেব বসুর মতো কাউকে খুঁজে পাওয়া দুর্লভ। তাপস রায় সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের যে উক্তি দিয়েছেন তাতে বোঝায় যায় কবির কবিতাপ্রীতি ও ভালোবাসা — “আমার অবাক লাগে, অবিরাম নিজে লিখেও অন্যের লেখা সম্বন্ধে কি করে একজন এতটা শ্রদ্ধা এতটা আগ্রহ দেখাবার ফুরসত করে উঠতে পেরেছেন! যখন প্রগতি বেরিয়েছে বলতে গেলে তখন থেকেই আধুনিক বাংলা সাহিত্যের সারথ্য তাঁর হাতে। তাই প্রতিপক্ষ সবচেয়ে বেশি শরবর্ষণ করেছে তাঁরই বিরুদ্ধে। সমকালীন লেখকদের মুক্তকণ্ঠে স্বাগত জানানো, অঙ্কুরেই প্রতিভাকে চিহ্নিত করা, বুক দিয়ে আগলানো- সাহিত্যে এভাবে ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর কাজ আর কে করেছেন? অথচ তার মধ্যে বিন্দুমাত্র মুরুব্বিয়ানার ভাব নেই। বাংলা সাহিত্যে তাঁর ভূমিকা পৃষ্ঠপোষকের নয় - প্রহর-জাগা শান্ত্রীর কিংবা সেনাপতির।”৩০ 

রামমোহন যেমন ১৯ শতকের কুসংস্কারের দুঃস্বপ্নকে দূর করে পুরোনো ক্ষয়িষ্ণু সমাজকে টেনে তুলেছিলেন আধুনিকতার দ্বারপ্রান্তে, বাংলা কবিতাকেও সেই ভাবে বিশ শতকের দ্বারপ্রান্তে একা একা প্রতিষ্ঠা করার বসনায় রত ছিলেন বুদ্ধদেব বসু। প্রাবন্ধিক তাপস রায়ের কথায় — “বিশ শতকের বাংলা কবিতায় এই নামটির এমন মহিমান্বিত হয়ে ওঠা এমনি এমনি হয়নি। বাংলা কবিতার নতুন স্বর ও স্পেস তৈরী করে বাংলা কবিতাকে ইউরোপীয় কবিতার সমান্তরালে বসিয়ে দেবার এমন আকাশ ছোঁবার সাধনা এর আগে এদেশে হয়নি। এরকম বহুমুখি প্রতিভা রবীন্দ্রনাথের পরে তিনিই দ্বিতীয়। রবীন্দ্রনাথ ছাড়া বাংলা সাহিত্যের এত বিস্তৃত প্রেক্ষাপট ধরে আর কেউই তেমন কাজ করেননি। তাঁর পা কোথায় পাতা নেই-একদিকে কালিদাস তো অন্যপ্রান্তে বোদলেয়ার, হোল্ডারলিন, রিলকে। ১৯৩০-এ ‘বন্দীর বন্দনা’ লিখে রবীন্দ্রনাথের কাছে স্বীকৃতি পাচ্ছেন। তখন তাঁর বয়স ২২ বছর। যা আধুনিকতার প্রথম বার্তাবাহক হয়তো।”৩১ 

তাপস রায় বুদ্ধদেব বসুকে মহাভারতের যুধিষ্ঠিরের সাথে তুলনা করেছেন, যিনি অপরের দুঃখে সর্বদাই কাতর হতেন। প্রবন্ধে উদ্ধৃত বিনয় মজুমদারের বক্তব্য থেকে এই বিষয়টি আরও সুদৃঢ় হয়ে ওঠে— “বুদ্ধদেব বসু ছিলেন তরুণ কবিদের অভিভাবক। শুধু মুখে মুখে নয়, আলাপে আলোচনায় নয়, কাজেও। অভিভাবকোচিত কাজকর্মও তিনি করেছেন। আমরা-‘কৃত্তিবাস’ গোষ্ঠীর কবিরা তাঁর কাছে সবচেয়ে বেশী ঋণী।’ এই সারথ্যের ভূমিকাটিকে তিনি জানতেন আর বলেও ফেলেন, ‘সাহিত্যে আমাকে যা আনন্দ দেয় তাতে অন্যরাও আনন্দিত হোক এই ইচ্ছার বেগ আমি সামলাতে পারি না; তার তাড়নায় এমন অনেক কাজ করে থাকি যাকে চলিত বাংলায় বলে বনের মোষ তাড়ানো।”৩২ — তাঁর এই ‘বনের মোষ তাড়ানো’ বা নিঃস্বার্থ সাহিত্যসেবার ব্যাপারটিকে প্রাবন্ধিক আরও বিস্তৃতভাবে আলোচনা করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, নিজে কবিতা রচনার পাশাপাশি অজিত দত্তের মতো কবিকে পাঠকের সামনে তুলে ধরার জন্য বুদ্ধদেব বসু সমালোচনামূলক লেখাও প্রকাশ করেন। অর্থাৎ, নিজে কবি হয়েও তিনি আরেকজন কবিকে তৈরি করার দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। কবিতার পরিমণ্ডলকে প্রসারিত করার লক্ষ্যে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি স্বতন্ত্র বিভাগও চালু করেন।

আসলে কবিতার ভবিষ্যৎ সম্পর্কে তাঁর একটি সুস্পষ্ট ধারণা ছিল। তিনি কবিতাকে এই পচনশীল পৃথিবীর সীমানা ছাড়িয়ে আরও ঊর্ধ্বে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। কবিতাকে তিনি ধর্মের মতোই অন্তরে ধারণ করেছিলেন বলেই রাসবিহারী অ্যাভিনিউয়ের তাঁর বাড়িটির নাম দিয়েছিলেন ‘কবিতাভবন’, যা সমকালীন সাহিত্যিকদের কাছে ছিল আক্ষরিক অর্থেই মন্দিরতুল্য। এই মন্দিরে সে-সময়ের দিকপাল সাহিত্যিকদের নিত্য আনাগোনা ছিল, যাঁদের উপস্থিতিতে প্রতিদিন সেখানে উন্মোচিত হতো কবি ও কবিতার নতুন ঝাঁপি। আর ঠিক সে জন্যই বুদ্ধদেব বসুকে উদ্দেশ করে লেখা শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের একটি পঙ্‌ক্তি উদ্ধৃত করে তাপস রায় লিখেছেন— “তোমার নিকটে এসে বৃক্ষের ভরসা পতো কবি, ছায়া পেত, সচ্ছলতা পেতো।”৩৩ 

আলোচ্য প্রবন্ধগুলির অন্তর্নিহিত ভাববস্তু বিশ্লেষণ করলে স্পষ্টতই প্রতীয়মান হয় যে, তাপস রায়ের ‘মিথ্যে মিথ্যে কবিতা’ গ্রন্থের প্রথম দিককার এই প্রবন্ধগুলিতে আধুনিক বাংলা কবিতার বাঁকবদলের এক সুস্পষ্ট মনস্তাত্ত্বিক ও শৈলীগত ইতিহাস উন্মোচিত হয়েছে। কবিতার অন্তর্গত ‘সত্য’ ও ‘মিথ্যা’র দ্বান্দ্বিক স্বরূপ বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে প্রাবন্ধিক যে দার্শনিক ভিত্তিমূল স্থাপন করেছেন, শক্তি চট্টোপাধ্যায় এবং জীবনানন্দ দাশের মূল্যায়নে এসে তা এক পূর্ণাঙ্গ রূপ লাভ করেছে।

প্রাবন্ধিক অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে দেখিয়েছেন কীভাবে কবিতার এই ‘মায়াময়’ বা অলীক জগতের ভেতর দিয়েই আধুনিক মানুষের অন্তর্লীন সত্যগুলো বেরিয়ে আসে। একদিকে শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের বোহেমিয়ান জীবন, প্রগাঢ় বিষাদময়তা ও স্বতঃস্ফূর্ত মৃত্যুচেতনার সাবলীল প্রকাশ; অন্যদিকে জীবনানন্দ দাশের সচেতন শব্দনির্মাণ, চিত্রকল্পের ব্যবহার এবং আধুনিক ‘জাদুভাষা’র প্রয়োগ— বাংলা কবিতার এই দুই ভিন্নমুখী অথচ যুগান্তকারী কাব্যস্রোতকে তাপস রায় অত্যন্ত নিপুণভাবে ব্যবচ্ছেদ করেছেন। শক্তির কবিতায় যেখানে শব্দের প্রথাগত শুচিবায়ু ভেঙে নৈঃশব্দ্যের ঘোর তৈরি হয়, জীবনানন্দের কবিতায় সেখানে তৈরি হয় মহাকালের সময়চেতনা ও বস্তুর অন্দরমহলের এক নতুন দীপ্তি।

আর এই সম্পূর্ণ বিবর্তনের একটি ঐতিহাসিক যোগসূত্র বা কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে উঠে এসেছেন বুদ্ধদেব বসু। শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিজীবনের উন্মেষ থেকে শুরু করে জীবনানন্দের শব্দ-ছন্দের স্বাতন্ত্র্য প্রতিষ্ঠায় বুদ্ধদেব বসুর যে সূক্ষ্ম সমঝদারি, প্রাবন্ধিক তা অত্যন্ত নৈর্ব্যক্তিকভাবে তুলে ধরেছেন। জীবনানন্দের ডিকশন ও ধ্বনিবৈশিষ্ট্যে মুগ্ধ হয়ে বুদ্ধদেব বসু যে অমোঘ মন্তব্যটি করেছিলেন— “জীবনানন্দকে বাদ দিয়ে ১৯৩০ পরবর্তী বাংলা কাব্যের কোনো সম্পূর্ণ আলোচনাই হতে পারে না”৩৪— তা মূলত এই প্রবন্ধের উপসংহার হিসেবে তাপস রায়েরও নিজস্ব সাহিত্য-দর্শনেরই প্রতিধ্বনি হয়ে ওঠে।

পরিশেষে বলা যায়, এই প্রবন্ধগুলোর মধ্য দিয়ে তাপস রায় কেবল ব্যক্তি-কবির বিচ্ছিন্ন মূল্যায়ন করেননি; বরং তিরিশ থেকে পঞ্চাশের দশক পর্যন্ত বাংলা কবিতার আধুনিক হয়ে ওঠার, প্রথা ভাঙার এবং নতুন ভাষা নির্মাণের এক মননশীল ও প্রামাণ্য দলিল রচনা করেছেন।


তথ্যসূত্র:-

১) দাশগুপ্ত, শ্রীশশীভূষণ, ‘বাঙলা-সাহিত্যের একদিক’,  শ্রীগুরু লাইব্রেরী, তৃতীয় সংস্করণ, বৈশাখ, ১৩৬৭ সন, পৃষ্ঠা ১২

২) গুপ্ত,  অতুলচন্দ্র, ‘প্রবন্ধসংগ্রহ’, প্রমথ চৌধুরী (ভূমিকা), বিশ্বভারতী গ্রন্থনবিভাগ, মে ১৯৯৮, পৃষ্ঠা ৯

৩) রায়, তাপস, ‘মিথ্যে মিথ্যে কবিতা’, প্রবন্ধ সংকলন, সুতরাং পাবলিশার্স, প্রথম প্রকাশ জুন ২০১৭, পৃষ্ঠা ৭

৪) রায়, তাপস, ‘মিথ্যে মিথ্যে কবিতা’, প্রবন্ধ সংকলন, সুতরাং পাবলিশার্স, প্রথম প্রকাশ জুন ২০১৭, পৃষ্ঠা ৮ 

৫) তদেব, পৃষ্ঠা ১১

৬) তদেব, পৃষ্ঠা ১১-১২

৭) তদেব, পৃষ্ঠা ১৪

৮) তদেব, পৃষ্ঠা ১৫

৯) তদেব, পৃষ্ঠা ১৫

১০) তদেব, পৃষ্ঠা ১৭

১১) তদেব, পৃষ্ঠা ১৮

১২) তদেব, পৃষ্ঠা ২১

১৩) তদেব, পৃষ্ঠা ২২

১৪) তদেব, পৃষ্ঠা ২২-২৩

১৫) তদেব, পৃষ্ঠা ২৬

১৬) তদেব, পৃষ্ঠা ২৬

১৭) তদেব, পৃষ্ঠা ২৭

১৮) তদেব, পৃষ্ঠা ২৮

১৯) তদেব, পৃষ্ঠা ২৯

২০) তদেব, পৃষ্ঠা ২৯

২১) তদেব, পৃষ্ঠা ৩১

২২) তদেব, পৃষ্ঠা ৩৪

২৩) চট্টোপাধ্যায়, তপনকুমার (সম্পাদনা), ‘আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস’ (আধুনিক যুগের সূচনা থেকে ২০০০ খ্রী: পর্যন্ত), প্রজ্ঞাবিকাশ, চতুর্থ সংস্করণ, আগস্ট-২০১১, পৃষ্ঠা ৪৩৮ 

২৪) রায়, তাপস, ‘মিথ্যে মিথ্যে কবিতা’, প্রবন্ধ সংকলন, সুতরাং পাবলিশার্স, প্রথম প্রকাশ জুন ২০১৭, পৃষ্ঠা ৩৬

২৫) তদেব, পৃষ্ঠা ৩৭

২৬) তদেব, পৃষ্ঠা ৩৭

২৭) তদেব, পৃষ্ঠা ৩৮

২৮) তদেব, পৃষ্ঠা ৩৮

২৯) তদেব, পৃষ্ঠা ৪২

৩০) তদেব, পৃষ্ঠা ৪৪

৩১) তদেব, পৃষ্ঠা ৪৬

৩২) তদেব, পৃষ্ঠা ৪৭

৩৩) তদেব, পৃষ্ঠা ৪৯

৩৪) চট্টোপাধ্যায়, তপনকুমার (সম্পাদনা), ‘আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস’ (আধুনিক যুগের সূচনা থেকে ২০০০ খ্রী: পর্যন্ত), প্রজ্ঞাবিকাশ, চতুর্থ সংস্করণ, আগস্ট-২০১১, পৃষ্ঠা ৪৩৮