সুকৃতি সিকদার-এর কবিতা
চিরকুট
কথা নেই, নেই যোগাযোগও…
ব্যথার বাহানা বোঝে বাম
নিজের ক্ষয়ের কথা ভুলে।
শব্দ নিঃস্ব হলে গলে যায়
ধাতুর দুদিক থেকে জল।
তোমাকে ছোঁয়ার অবিরাম অপেক্ষায়
পাথর সমান হয়ে আসে
পথ যায় পিছলে কেবলই!
বলো হাত রাখবো কোথায়? বলো।
এই মাথা, এই বুক কোথায় রাখবো?
তোমার কষ্টের দিন আজও
অজস্র অশ্বত্থপাতা ঝরে যায়।
গুদগুদি
মানুষের মতো ভালো সর্বভুক নাই;
অমানুষ আরও বেশি ভালো।
কষ্টের পকোড়া প্রিয় তার,
অবহেলার চাটনি দিয়ে
খাওয়ার সময়
চোখের নুনের কাছাকাছি
মনে হয় নিজেকে নবাব।
একথা ভাবতে গেলে ট্রেনারও লম্বা হয়ে যায়।
লাইনের উপর চাকার ভীমরতি
বোঝে না উপচে পড়া অযথা মানুষ।
তোমার বাড়ির দিকে যেতে যেতে, ট্রেন
হঠাৎ ভ্যানিশ হয়ে যায়!
চেনাদের সাথে
কবিতা লিখতে এসে চেনাদের সাথে
দেখা হল অনেক আসরে।
দেখা হলে তারা চমকায়
সবার প্রথম, তারপর
ছোনা-মনা-বাবু বলে ডেকে
মাঝেমাঝে আলেয়া ছড়ায়।
ভুলে যায়, বাবু কার লেখা ছিল যেন!
কেউ বুবু বলেও তো ডাকে
কখনো আড়ালে
কানের নিকটে নিয়ে ঠোঁট
হাসি দ্যায় ফিস ফিস হিস…
আর বলে দাঁত অপরিহার্য নয়
সকল হাসিতে।
তাঁরা স্কচ খাওয়ার সময় কচ কচ শব্দ হয়।
মনে হয় পুরাতন খাটিয়ার মতো
সময়ের পায়া গুলো নড়ে।
পুরস্কার
নরম কুসুম কলি দেখে
পাতার আড়ালে খুন হয়ে গেছি একদিন।
এই যে আমরা ছুটে বেড়াই পুরস্কারের লোভে
সেই লোভ সম্বরণ করতে পারাই
সব চেয়ে বড় পুরস্কার
জেনো, এই তরল জীবনে।
যতোই বারোটা-বারো বাজুক ঘড়িতে,
কতিপয় সময়ের যোগফল সেও
এক হয়ে ওঠে সোজা, অপেক্ষার আয়ুর উপর।
আমাকে দেখার সেই চোখ দাও ফিরিয়ে কেবল।
যখন ফাগুন মানে মনে হত বাসন্তী ওড়না
কিংবা তার ওড়নার রং যখনই বদলে যাক, ধরা পড়ে যেতো ঠিক ঋতু।
ফুল গুলি ঝরে যেতো নদীর বকুলে
বুকে তার মেঘের চরণ।
বয়স
আমারই নাকের দোষ প্রতিটা বৃষ্টির
পরে আর সোঁদা ঘ্রাণ পাই না সেভাবে।
তুমিও কেমন যেন অস্ফুটনাঙ্কের মতো আজ
দূরে দূরে নুপুর বাজাও।
আমিও পাথর মতে বোবা,
ভারি বুক উঁচু করে ঘুরি।
ব্লেডের ঠোঁটের মতো প্রেমে
জিভ রাখি সাপের ভাষায়;
তোমার অপ্রেম, অবহেলা…
নিজেকে কীটের মতো মনে হয় ফলের বাগানে!
বাতাস আসে না…
আমারই নিঃশ্বাসে নড়ে ওঠে পাতাগুলো।
ফুলগুলি তোমার কৃপায় ঝরে যায়।
পাথরাধিকা
স্টেশন ছিঁড়ে গেল পরিযায়ী ট্রেন…
সেই থেকে উথাল পাথাল এই বুকে।
পকেটের ফুটো দিয়ে আমি
সময় চুলকে নিতে গিয়ে
টের পাই আঙুলের ফাঁকে
অনেক প্রাচীন সেই বটতলা কাঁদিছে এখন!
মাটিতে নামাতে গিয়ে ঝুরি, যার পাতা
মাথার উপরে একদিন
দুহাত উপুড় করে ছিল
আর ছায়া, পাখির পালক।
কপাল খোলেনি তবু পালে লেগে হাওয়া
আমাদের বুক গেল ফুলে।
কোনার্কের দেওয়াল থেকে এই
সমতলাবধি
তুমি পথরাধিকার মতো
যেখানে জলের চিহ্ন ফেলে রেখে গেছো
নিশি পদ্ম ফুটেছে সেখানে।
ভ্রমরের গুঞ্জরণ থেকে বহুদূর
শব্দহীন রোদনের মতো
বাজে তার রেণুর নুপুর।
ঋণ
কী ভাবে বোঝাবো জল যদি না বুঝতে চায় নদী।
স্রোতে তো লেখাই আছে নাম
কলমের সুখের উপরে।
তবু তুমি বললে বোঝো না।
ভয় হয়— ভুলে যাবে না তো
আমাদের পাখি জন্ম, আকাশের কথা!
এ নিঃস্বতা যেন ইউক্যালিপটাস গাছের
বাকলে বাকলে ওঠা পাতলা সরের মতো অবিরাম...
কোথাও নিস্তার নেই, অবিন্যাস্ত ছায়াপথ নেমে
এসেছে জলের বুকে, বাতাসে ঝড়ের গন্ধ নেই।
জ্বলে উঠবার আগে একাকী বারুদ
করে হাহাকার কাঠির শরীরে;
আমি শুধু অকারণ এইসব
মেনে না নিতে পারার ব্যার্থতায় দুমদাম
পাখির বাসার কাছে চেয়েছি প্রশ্রয়
আর ফেলেছি মনের ভুলে কেঁদে!
বসন্তে পাতার গান
বসন্তে পাতার গান চুরি করে নিয়ে গেছে হাওয়া
পড়ে আছে দেহ তার হলুদ শরীরে।
কী আছে কী আছে এই আমের মুকুলে
ফুলে ফুলে জানে ভালো মাতাল ভ্রমর,
নাচের শরীর থেকে রেণুর কথন ঝরে তার।
মনে হয় ঝিমধরা মফস্বল ঘুরে
গাছের তলায় মৃদু সময়ের হাত ধরে বসি।
বেগনি ও গোলাপির এমন মিলন
জানে শুধু অনন্ত ফাগুন তার গুনে,
রঙিন কাঞ্চন এই কথা বলে যায়
শাখার রূঢ়তা কিংবা কন্টকের ধার
কোনো দিকে নাই তার এখন পরোয়া।
প্রেমিকার দীর্ঘ অপেক্ষার মতো পথ
আরো দীর্ঘ হতে হতে বিন্দুতে পরিণত হয়।
গোলমাল
একদা আমার ছিল একটি প্রেমিকা।
কথা সে বলত কম, ঝুঁকি নিতো বেশি।
দেখা হলে আমি তার জুতোর হিলের
হাইট দেখিয়া বুঝি মনোভাব খানি।
হিলের উচ্চতা কম-বেশির উপরে
ধাতুর চমক তার দেখাতো পারদে।
পাহাড়েরও প্রতি তার ছিল টান, তবু
কোনোদিনও ভাবে নাই হিলারি নিজেকে।
কিন্তু তার হিলিংয়ামি পেতাম যখন
কমে যেতো ধীরে ধীরে আঙুলের জ্বরও।
জানি না কী ছিল তার চোখের মণিতে
দেখলেই মনে হত ছুঁয়ে দিয়ে আসি।
আসি আসি করে শেষে রিলেশনটাই
একদিন টুপ করে গেল কাট হয়ে!
আজও মনে পড়ে তার গোলগোল দুটো
নয়নের তলে জল কীভাবে ঝাঁপাতো!
অথচ সে চোখে যেই গলাতো চশমা
আমাদের ছায়া দুটো দেওয়ালের গায়ে
পড়ত এমন ভাবে, মনে হত আমি
যুগ যুগ ধরে তার কোলে বসে আছি।
কাগজের দেবতা
আমাদের কাগজ আমরা দেখিয়েছি
এবার আপনি আপনারটা দেখান।
আমারই কানের দোষ, নিন্দুকের মুখ থেকে শুনি—
আসলে আপনি নুরুদ্দীন মহম্মদ নামে
শত্রু দেশের এক এজেন্টের ক্লোন।
চাঁদা খান ওরফে আপনি
ট্রাবনের কূটনৈতিক চালে করে ভর
জনতার মাথায় ওঠেন আর
মাঝেমাঝে প্লাস্টিক সার্জারি করে
চেহারায় বদল ঘটান।
কখনও কৃষ্ণ সেজে ফুঁ দেন বাঁশিতে
কখনও বা রাম সেজে চাঁদা লুটে খান।
দস্যু রত্নাকর
কবিতাও পাল্টি খেয়ে গেছে
নাকি পথ বদলে নিয়েছে
সঠিক বুঝি না তবু ফিল করি কেউ
গনতন্ত্রের টিপে ধরছে গলা।
দূর থেকে সবাই মাস্টার…
আরো দূর থেকে সকলকে
বেটিং করছে মনে হয়
প্রতিপল জুয়ার টেবিলে।
এমতাবস্থায় নিজের পেনকে নিয়ে
ঝামেলার শেষ নাই আর!
কখন যে কী লিখে ফেলে সে
জৈবিক চাহিদার মতো
লেগে যায় জনতার গায়ে!
জনতা আমাকে মাকু বলে গালাগালি দ্যায়
জনতা আমাকে তিনু বলে গালাগালি দ্যায়
জনতা আমাকে চাড্ডি বলে গালাগালি দ্যায়…
আশ্চর্যের বিষয় জনতা জনার্দন
কবি বলে গালাগালি করে না এখন!
আমি লিখি সেইসব লালেদের নিয়ে
যারা একদিন খুব সহজে সবুজ হয়ে গেল;
সুগভীর অরণ্যের মতো ছিল যারা
রাতারাতি হয়ে গেল ভীষণ গে ড়ুয়া।
বন্ধুদের বাইরের রং পাল্টালেও
বন্ধু পাল্টে যায় না কখনও।
আগেও ওদের সাথে দেখা হতো
এখনও ওদের সাথে দেখা হয়।
আগে ওরা বলতে বলত, 'ইনক্লাব'।
আরামি ইনক্লাব বলতে গিয়ে
বলতাম, 'ইঙ্ক লাভ'।
সবাই তোতলা বলে ক্ষ্যাপাতো আমাকে।
যখন আমাকে ওরা, 'জয় বাংলা' বলতে বলত…
জয় বাংলা বলতে গেলেই
হয়ে যেত, 'জয়, ভাঙ লা'।
ওরাও তোতলা বলে ক্ষ্যাপাতো আমাকে।
এখন ওদের সাথে দেখা হলে, 'রাম রাম' করে।
আমিও ওদের মতো যতবার 'রাম রাম' করি
মুখ দিয়ে ততোবার 'মরা মরা' উচ্চারিত হয়।
জেনন
ভয়ানক একটা খারাপ পরিস্থিতির ভেতর
নিস্ক্রিয় মৌলের মতো বিলং করছি
বলা যায় বিরাজিত রয়েছি এখন।
এক মাথা দহনে উর্বর
এক মাথা ভর্তি ভালোবাসা
যেন এক জরাসন্ধ আজ
সহজাত পাতানো সংসারে।
যতবার সুগন্ধ ছড়ায়ে দিতে চাই
পোড়া ঘ্রাণ বিকিরিত হয়
মনে পড়ে পর্যায় সারণী
আমার আয়ুর থেকে খুব
বেশি দূরে নয়।