মৌমিতা সাহা-র কবিতা

কবিজন্ম

 মৌমিতা সাহা-র কবিতা


অন্যরকম পূজো 


ওদের পূজো শুরু হয় দশমীর রাতে,

ঘন অন্ধকারে, সব কটা প্রতিমা বিসর্জনের শেষে।

পুজোর ভিড়, ঝাঁ চকচকে মন্ডপ ওদের টানে না কখনো;

ওরাও কিন্তু কচিকাঁচাদের দল, শরীরে মনে একশো ঘোড়ার বল;

ওরা ডুব দেয় এ নদীতে, সে নদীতে, অনেক অনেক অতল গভীরে,

অন্যকে হারিয়ে দিয়ে, পিছনে ফেলে কে পৌঁছাবে কার আগে,

আর তুলে আনবে ভেসে যাওয়া প্রতিমার পড়ে থাকা শূণ্য কাঠামো।

আর ভাগ্য ভালো থাকলে পাওয়া যায় এমত- দুটো পয়সা কখনো।

এমন ভাবে কাঠামো কুড়োনোর প্রতিযোগিতা চলে বেশ কয়েকটি দিন,

যতো বেশি কাঠামো, মনে বাজে তত বেশি খুশির বীণ।

তারপরে চলে মন দিয়ে ঐ কাঠামোগুলোর সযতনে লালন-পালন।

রোদ- জল তুচ্ছ করে, ওরা কাঠামোগুলোকে আগলে রাখে,

এমনকি খাওয়া- দাওয়া ভুলে গিয়ে ওরা ঐ খেলতেই মেতে থাকে,

                 শোনে না কারো বারণ।

এর পর শিল্পী পাড়াতে শুধু ঘুরে বেড়ানোর পালা,

কাঠামোগুলো বিক্রি করে দুটো পয়সা নিয়ে ঘরে ফেরা।

একটা- দুটো পয়সা জমিয়ে বন্ধুদের কে সঙ্গে করে জমিয়ে আড্ডা দেওয়া ।

জামা- জুতো নাই বা হলো, তবু এটা ওদের আসল পূজো ।

ওদের মনে দাগ কাটে না আসল পুজোর রোশনাই, অথবা নতুন জামার গন্ধ;

মন্ডপে মন্ডপে ঘুরে প্রসাদ সংগ্রহ তেই ওরা বেজায় খুশী, এটাই ওদের আনন্দ।

ওরা আসলে অপেক্ষা করে থাকে পূজো শেষ হবে কবে??

ওদের কাউন্টডাউন শুরু হয় দশমীর রাত থেকে,

কাঠামোগুলোর লাভজনক মীমাংসায় ওদের দেবিপক্ষের সূচনা;

যেদিন ভালো খাবার জোটে, অষ্টমীর রাত হয়ে ওঠে সেটা।

একটু হাসি, ইয়ার্কি আর আড্ডা নবমীর রাতের মতো করে থাকে তোলা;

সবটুকু ফুরিয়ে গেলে যখন দশমীতে ফেরা, 

আবার একটা নতুন দশমীর জন্য শুধুই অপেক্ষা করা।

আমজনতার সপ্তাহব্যাপী পুজোর থেকে ওদের এই দিন তিনেকের পুজোর মজা

কেউ জানে না, কেউ বোঝে না; এটাই ওদের সারা বছরের একমাত্র র্বিলাসিতা ।।




দেবিপক্ষ


শরৎ আকাশে যখন পেঁজা মেঘের রমরমা

   কাশ ফুলে সুর তুলেছে রাগ ভৈরব

শিশির ভেজা সোঁদা গন্ধ তখন

    দেবীপক্ষের আবাহনে ব্যস্ত।।


মৃন্ময়ী তখন ভুবনমোহিনী,

    বিকরিত হয় চিন্ময়ী মায়ের রুপচ্ছটা;

শহর থেকে গ্রামে, অলিতে গলিতে

     চাঁদের কনারা উপচে পড়ে ভিড় করে।


ঘরের বাইরে, আনাচে কানাচে,

     উঠোনে, দালানে তাদের অবাধ যাতায়াত।

তবু পাঁচিলের ও পারে জমে 

     অমানিশার নিকষ কালো।।


সেখানে প্রতি মুহুর্তে চিন্ময়ী মা

      সেজে ওঠে মৃন্ময়ীর মিথ্যলঙ্কারে;

কামিনী কাঞ্চনের ঘেরাটোপে 

      ভাঙতে থাকে নারীত্বের মাতৃভাষা ।





মহালয়ার শুভ সূচনায়

       যখন পিতৃপক্ষের অবসান,

দেবীপক্ষের দেবীরা তখন 

       দাঁড়িয়ে চলমান হাড়িকাঠে।।



সময়ের প্রবাহমানতায় হার না মানা 

        অদম্য ইচ্ছাশক্তির দশমী নামে

প্রতিটা নতুন সূর্যের সাথে, 

         দিগন্ত বিস্তৃত রক্তিম আল্পনায়।


মধ্য গগনে প্রাঞ্জল হলুদ রবিলেখা 

         কলম চালাচ্ছে কি অনায়াসে!

অস্তায়মান সূর্যের পাশ্চাত্য সমীরে একদিন

         উদিত হবে নারীর নিজস্ব বিজয়গাথা ।